28 C
Kolkata
Wednesday, May 6, 2026
spot_img

হিন্দুত্বের ন্যারেটিভ না তৃণমুলের ভুলের মাশুল ? বাংলায় বিজেপির জয়ের নেপথ্যে লুকিয়ে কোন সত্য ?

Aaj India Desk, কলকাতা: বঙ্গের বুকে ভাজপার রণডঙ্কার। ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) সরকার। রাজ্যে এবার ডাবল ইঞ্জিন সরকার। কয়েকটা বিষয় খুব খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটা জিনিস লিখে আমিই Clear হতে চাই, তাই এই লেখা। এবারের নির্বাচন যেখানে সবথেকে আলাদা। এই ভোট হিন্দুত্বের ভোট। যেখানে বাংলার ৩০ % সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে বামেরা বা তৃণমূল যে খেলা খেলত, তা কাজ করেনি। বরং হিন্দুত্বের ভোটের দুই তৃতীয়াংশ আর সংখ্যালঘু ভোটের কম বেশি ২৫ শতাংশ টার্গেট করেছিল বিজেপি। অঙ্ক এতটাই জটিল ছিল, যে বাংলার রাজনীতিবিদ, এমন কী বাংলার বিজেপি নেতাদেরও মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে সম্পূর্ণ বিষয়টি।

যেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, “একটা কমিউনিটি ঘিরে ধরলে পালাবার পথ পাবেন না”, সেদিনই ইতিহাস লেখা হয়ে গিয়েছিল। বাঙালির সেকুলারিজমকে ধাক্কা মেরে জিতেছিল হিন্দুত্ববাদ এবং জাতীয়তাবাদ। যার অর্থ, নিজের হাতে তিলে তিলে সাজানো সাম্রাজ্যের এক একটি ইঁট নিজের হাতেই খুলে ফেলা, যা করেছেন মমতা স্বয়ং। একটি নতুন সরকার গঠনের প্রেক্ষিতে যেটা না তুলে ধরলেই নয়। এই যে তৃণমূলের ইলিউশন ভোট, এর পিছনে মেশিনারি আছে কি নেই, সেটা অন্য প্রশ্ন। অমিত শাহ ১৫ দিন ধরে রাজ্যে পড়ে ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী এসে ঝালমুড়ি খেলেন, এত প্রচার করলেন। আর তাতেই রাজ্যের মানুষ নরেন্দ্র মোদীর বার্তা শুনে পরিবর্তনের আশায় ভোট দিল। বিষয়টা কী এত সহজ? শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি যে, পশ্চিমবঙ্গকে ঠিক পাকিস্তান হিসেবেই ট্রিট করেছে কেন্দ্র সরকার। এরপর যে লাইনটা বলব, সেটা শুনে চমকে গিয়েছিলাম আমি নিজেই। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ পরিবর্তন দরকার, তাই এতে Involve ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কূটনৈতিক গেমপ্ল্যান বানিয়ে মসনদে বসেছে বিজেপি। 2025 এর সেপ্টেম্বরে আর্মির একটা ইভেন্টে মোদি, অমিত শাহ আর অজিত ডোভাল ফোর্ট উইলিয়াম এসেছিলেন। সেখানেই এই নির্বাচনের সব প্ল্যান সেরে ফেলা হয়েছিল। আর এবারের দুই দফার ভোটে CASF এর উচ্চপদস্থ সব ডিজি কলকাতা অফিসে পোস্টেড ছিলেন। কিছু ডিজি নিজে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ডহারবার মডেলের ভোটের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সীমান্ত থেকে লোক ঢুকছে কিনা, কেন্দ্রের বিশেষ নজর ছিল সীমান্ত বর্তী জেলাগুলিতে।

আপনি বলতেই পারেন, এই রাজ্য তো সত্যি বাংলাদেশ হতে বসেছিল। অশুভ ইসলামিক শক্তি মাথাচাড়া দিয়েছিল। কয়েকদিন পর হিন্দুদের সব জমিবাড়ি দখল হয়ে যেত। রাজনৈতিক দল যখন ন্যারেটিভ বানায়, তাতে লক্ষ্য কী থাকে, সরকার তৈরি করা। ক্ষমতা দখল করা। তাই তাদের আদর্শ অনুযায়ী ন্যারেটিভ তৈরি হয় সব সময়। কিন্তু কেন্দ্র জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যখন ন্যারেটিভ বানায়, সেটা পরোক্ষে যুদ্ধই হয়। আর সেই যুদ্ধে জয়লাভ করেছে বিজেপি। এরপরেও আপনি বলবেন, আজকের হাওয়া বুঝে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্র চাইলে এমার্জেন্সি ঘোষণা করতে পারত। করেনি। কেন্দ্র চাইলে, মমতাকে গ্রেফতার করতে পারত, করেনি। বরং ভোট করিয়ে সুস্থভাবে নির্বাচন করেছে। আমিও বলছি না, বিজেপি কিছু ভুল করেছে। আমি শুধু পয়েন্ট আউট করলাম। ন্যারেটিভটা রাজনৈতিক ছিল না, ছিল কূটনৈতিক। এই অনুপ্রবেশের তত্ত্ব, এই যে বাংলাকে বাংলাদেশ বানানোর তত্ত্ব, বা আর্বান নক্সালিজমকে থ্রেট, বিজেপির প্রচারে তাই এগুলোই বারবার উঠে এসেছে। যে ন্যারেটিভ কোনও ভাবেই রাজনৈতিক নয়। যদি রাজনৈতিক হত, তা হলে ন্যারেটিভ হত আরজি কর হত্যা, ন্যারেটিভ হত চাকরি চুরি, ডিএ বৃদ্ধি। এগুলো ছিল, কিন্তু বিজেপি একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিল, মমতা বঙ্গের বুকে বিজেপি (BJP) আতঙ্কের রাজনীতি তৈরি করেছেন, যা কিনা বামেদেরই বানানো। তাই তৃণমূল যতই চুরি করুক, সেই আতঙ্কে প্রাক্তন বাম- প্রা্ক্তন কংগ্রেস, বর্তমান কংগ্রেস ও বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থকরা, যার অর্থ একটা বিরাট বড় সংখ্যক ভোট, সেটি মমতাই ধরে রাখবেন।

জাতীয় নিরাপত্তা তো একটা পয়েন্ট। কিন্তু এটাই শেষ নয়। তৃণমূলকে সিংহাসনচ্যূত করার নেপথ্যে আরও একটি অনুমানযোগ্য কারণের নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাঁ। ৫০ বছর ধরে পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী খুঁজেই পাননি কীসের বলে তিনি এত বড় নেতা! ভবানীপুরে নিজের শিষ্য শুভেন্দুর কাছে মমতা হেরে গিয়েছেন। দিদির রাজনীতির পথ অনুসরণ করে যিনি রাজ্যের তৃতীয় পরিবর্তনের কাণ্ডারি। সেই শুভেন্দুর সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছিল কে? শুরুটা যদিও হয়েছিল, সেই মানুষটার হাত ধরে। মুকুল রায়। ২০১১ নির্বাচনের ভোট মেশিনারি যার হাতে ছিল। তাঁর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার যে পরিকল্পনা, খুব সুচারু ভাবে অভিষেকের তৈরি করা নয় তো? এখন একটু গভীরে ভাবার সময় এসেছে। ভুলে যান সারদা স্ক্যাম। আপনি শুধু মনে করুন নারদা স্ক্যাম। ম্যাথুউ স্যামুয়েলের কাছে যাদের যাদের ভিডিও ছিল, সেই মুখগুলো মনে করুন। এরা প্রত্যেকেই ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের কাঁটা। সম্পূর্ণ আমার অনুমান, কেন্দ্রের সঙ্গে আঁতাত করে সিবিআই-ইডি দিয়ে পিসিকে ভয় দেখানো আর নারদা দিয়ে দলের সিনিয়র লিডারদের ভয় দেখিয়ে, নিজের গ্রাউন্ড তৈরি করার চেষ্টা তাঁর সফলই হয়েছিল। এরপর একে একে সব নেতাদের সঙ্গে মমতার একটা হিমশীতল সম্পর্ক কি তৈরি করিয়েছেন তিনিই?

নন্দীগ্রাম লড়াইয়ের সঙ্গী শুভেন্দু অধিকারী সরলেন, সরলেন মুকুল রায়। সৌগত রায় থাকলেন, কিন্তু না থাকার মতোই। মদন মিত্র, পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে জেল খাটালেন। নিয়ে এলেন আইপ্যাক। যে আইপ্যাক মোদীর ২০১৪ এর সেই বিখ্যাত ক্যাম্পেন করেছিল, আব কি বার, মোদী সরকার, সেই আই প্যাক ধীরে ধীরে শুধু এই রাজ্যের তৃণমূল নির্ভর সংস্থা হয়ে গেল কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে? তার কারণটাও জলের মতো স্পষ্ট। আই প্যাক হচ্ছে সেই সেতু, যেখানে বিজেপি সম্পূর্ণ তৃণমূলের অন্দরের খবর জোগাড় করত। আর দেশের কাছে, বা সরকারিভাবে জানাত, তাঁরা তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে। ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৪, দুটো লোকসভা, একটা বিধানসভাতে জয়ের পর আইপ্যাককে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না তৃণমূলের পোড় খাওয়া নেতাদের। আর না মানলে কী হবে, সেটাও জানতেন তাঁরা। কিন্তু রাজনীতির শতরঞ্জ এমন ছিল, তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। কারণ ক্যামাক স্ট্রিটের ওই অফিসে যা যা চলত, তা পার্টির নেতারা ভাল করেই জানেন, জানেন স্বয়ং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকেও এমন কিছু ভয় দেখিয়ে রাখা হয়েছিল কিনা, তা তো সময় এলে জানাই যাবে। তবে অভিষেক পর্বের আরও একটা কথা না বললেই নয়, তবে তার এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই আবার আছেও। অভিষেকের স্ত্রীর সোনাপাচার করার যে ঘটনা, সেই চক্র যদি কোনও দিন সামনে আসে, তা হলে মানুষ জানতে পারবে, এই দমদম বিমানবন্দরকে কীভাবে আন্তর্জাতিক স্মাগলিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে জাতীয় সুরক্ষার সঙ্গে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। 

 সামনে অনেক খেলা বাকি। নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিজেপি। আর সেই নিরঙ্কুশ জয়ের আফটারম্যাথ কী হবে, তা তো সময় বলবে। বাংলার অধিকাংশ মানুষ আজ বিজেপির জয়কে মন থেকে মেনে নিয়েছেন, এটা ভেবে, যে মমতার পতন হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তৃণমূল আবার ফিরবে। আর বিজেপি জানে, তারা একবার এলে সেই রাজ্য কীভাবে করায়ত্ত করতে হয়। বিরোধীদের সরাতে ২ মিনিট লাগে না। তৃণমূলের কোনও নেতার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান না রেখেই বলছি, নেত্রী মমতার মতো আবেগী চরিত্র এই বাংলা আর পাবে না। তাই যতদিন তিনি জীবিত আছেন, তাঁর পরিবেষ্টিত শত্রুদের চিহ্নিত করাই প্রধান কাজ ও দায়িত্ব হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন