SPECIAL FEATURE
“উনি আত্মহত্যা করেছিলেন”….
বাংলার মহানায়ক। পর্দায় যাঁর হাসি ছিল প্রেমের ভাষা, যাঁর চোখে ছিল বাঙালির স্বপ্ন, যাঁকে ঘিরে ছিল অফুরন্ত উন্মাদনা। অথচ তাঁর কাছের মানুষদের কথায়, জীবনের শেষ কয়েক বছরে সেই মানুষটিই যেন পুরোদস্তর একা হয়ে গেছিলেন। কখনও আনমনে বলেছিলেন, “আমি আর থাকব না”, আবার কখনও বলেছেন, “আমি বেশিদিন নেই”। আজ পিছন ফিরে তাকালে সেই কথাগুলোই যেন এক একটি অদ্ভুত পূর্বাভাস। (Uttam Kumar)
সালটা ১৯৭৫। স্টুডিয়ো পাড়ায় একের পর এক লোডশেডিং। শুটিং কার্যত থমকে যাচ্ছে। সমস্যা জানাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে মহাকরণে যাচ্ছেন সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং উত্তম কুমার। গাড়িতে হঠাৎ উত্তম কুমারের প্রশ্ন— “মানিকদা, আপনি আমাকে আর কোনও চরিত্রে নিচ্ছেন না?” সত্যজিৎ রায়ের উত্তর ছিল স্বাভাবিক। উত্তম তখন এমন এক বয়সে, যেখানে তাঁকে একেবারে তরুণও বলা যায় না, আবার বয়স্ক চরিত্রেও মানায় না। তিনি বলেছিলেন, একটু বয়স বাড়ুক, তখন তাঁকে অন্য ধরনের চরিত্রে নেওয়া যাবে। উত্তম কুমার সঙ্গে সঙ্গেই কথাটা থামিয়ে দিয়েছিলেন, “আমি আর বুড়োর পার্ট করতে পারব না। পুলু করবে।”
তখন কথাটা হয়তো নিছক রসিকতা ছিল। হয়তো অভিনেতার স্বাভাবিক আত্মসচেতনতা। কিন্তু সময়ের ক্যালেন্ডারে কয়েকটি বছর এগিয়ে গেলে সেই কথাই যেন অন্য অর্থ নেয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরে এক সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, উত্তমদা যা বলেছিলেন, আশ্চর্যভাবে সবই যেন সত্যি হয়ে গেল।
আর একটা কথা উত্তম (Uttam Kumar) প্রায়ই বলতেন, “আর ভালো লাগছে না।” কেন ভালো লাগছিল না? খ্যাতির অভাব ছিল না। অর্থের অভাব ছিল না। মানুষের ভালোবাসা, সম্মানেরও অভাব ছিল না। রাস্তায় বেরোলেই তাঁকে ঘিরে ভিড় জমত। বাংলার সিনেমা তাঁকে এমন এক উচ্চতায় বসিয়েছিল, যেখানে পৌঁছনো প্রায় দুঃসাধ্য। তবে কি সেই উচ্চতাই একা করে দিয়েছিল তাঁকে?
আর একটি ঘটনা বেশ অদ্ভুত। সত্তরের দশকের শেষভাগ। কলকাতায় মেট্রোর কাজ চলছে। রাস্তায় যানজট, শহরের চেহারায় অস্থিরতা। একদিন গাড়িতে বসে এক সহশিল্পীকে উত্তম কুমার বলেছিলেন, মেট্রো চালু হলে কলকাতার চেহারা বদলে যাবে। সাধারণ একটি ভবিষ্যৎ নিয়ে কথোপকথন। কিন্তু উত্তমের উত্তর? “এসব আমি দেখতে পাব না। তোমরা দেখতে পাবে।” একজন মানুষ কি সত্যিই নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন? নাকি আমরা আজকের চোখ দিয়ে অতীতের কথাগুলোর মধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী খুঁজে নিচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনওদিন পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাঁর কাছের মানুষদের স্মৃতিতে আরও একটি বাক্য বারবার ফিরে আসে। “আমি এখন একা হয়ে যাব। কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না।” “একা” – এই শব্দটিই হয়তো উত্তম কুমারের শেষ জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য। রবি ঘোষ একবার উত্তম কুমারকে নিয়ে লিখেছিলেন এমন একটি কথা, যা মহানায়কের বাইরের চাকচিক্য সরিয়ে ভিতরের মানুষটিকে সামনে এনে দেয়। হাজার হাজার মানুষ তাঁকে ভালোবাসে। সবাই তাঁকে দেখতে চায়, ছুঁতে চায়। অথচ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি উত্তম কুমার সারাদিন মায়ের অপেক্ষায় থাকতেন। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য তাঁর সেই আকুলতা দেখে রবি ঘোষের মনে হয়েছিল, এই মানুষটিও আসলে কতটা অসহায়! হয়তো এটাই তারকা হওয়ার সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস। যাঁকে সবাই চেনে, সবাই চায়, তাঁর নিজের আপনজন বলতে কতজনই বা থাকে ?
২৩ জুলাই, ১৯৮০। দিনভর শুটিংয়ের পর উত্তম কুমার গেলেন প্রযোজক দেবাল ঘোষের নতুন ফ্ল্যাটের পার্টিতে। রাত বাড়ল। আড্ডা চলল। মদ্যপানও হল। শেষরাতে বাড়ি ফিরলেন তিনি। পরদিন ভোর। প্রায় সাড়ে পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর মেয়ে সোমার সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন উত্তম। হাঁটতে হাঁটতে সোমার চোখে পড়ল, উত্তম কুমার অস্বাভাবিকভাবে ঘামছেন।
সে বলেছিল, “বাবি, এত ঘামছ কেন?”
উত্তম উত্তর দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ। বুকটাও ব্যথা করছে। বরং বেলভিউয়ের দিকে একটু ঘুরে যাই।” হাঁটতে হাঁটতেই তিনি পৌঁছে গেলেন বেলভিউয়ে। তারপর শুরু হল লড়াই, যার শেষ রাত ৯টা ৩২ মিনিটে।
২৪ জুলাই, ১৯৮০। বাংলা হারাল তার মহানায়ককে। কিন্তু মৃত্যুর পরও যেন শেষ হয়নি তাঁর গল্প। ভবানীপুরের বাড়িতে তাঁর প্রিয় অ্যাম্বাসাডরে করে নিয়ে আসা হল নিথর শরীর। বাইরে তখন কান্না, ভিড়, বিশ্বাস করতে না পারা মানুষের ঢল। যে মানুষকে পর্দায় দেখে মানুষ তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল, তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে প্রেমে পড়েছিল, সেই মানুষটি সেদিন পর্দার বাইরে চিরতরে নীরব।
বেশ কিছুদিন পর তাঁর ডায়েরির পাতা উল্টাতে দেখা যায়, ২৩, ২৪ এবং ২৫ জুলাইয়ের পাতায় সবুজ কালিতে লেখা ছিল, “ডাবিং ওগো বধূ।” ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এর নাম কেটে দেওয়া। ২৬ জুলাইয়ের পাতায় কয়েকটি জায়গায় লেখা “Rest”
বিশ্রাম
একটি মাত্র শব্দ। যে মানুষ সারাজীবন কাজ করেছেন, ছুটেছেন, অভিনয় করেছেন, মানুষের ভালোবাসার ভার বহন করেছেন, তিনি শেষ পাতায় এসে যেন শুধু বিশ্রামের কথাই লিখে গেলেন।
সেটা কি কাকতালীয়? নাকি সত্যিই তিনি নিজের শরীরের ভিতরে আসন্ন অন্ধকারের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন?
আমরা কেউই তা নিশ্চিত ভাবে জানি না, হয়তো জানার কোনও উপায়ও নেই। কিন্তু উত্তম কুমারের মৃত্যুর ঘটনাকে শুধু একজন মহান অভিনেতার হৃদরোগে মৃত্যু বলে এড়িয়ে গেলে তাঁর সত্তাকেই যেনো অস্বীকার করা হয়। কারণ তাঁর শেষ দিনগুলির চারপাশে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব বাক্য, ইঙ্গিত, একাকিত্ব….
যে মানুষকে ঘিরে লক্ষ মানুষের উন্মাদনা, তিনি নিজের ভিতরে সম্পূর্ণ একা। যে মানুষকে ছুঁতে চাইত সবাই, তিনি অপেক্ষা করতেন নিজের মায়ের জন্য। আর যে মানুষটির জন্য আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মৃতিচারণ করে, তাঁর নিজের ডায়েরির শেষ দিকের পাতায় ছিল “Rest”।
কী আশ্চর্য পরিহাস! বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে কখনও একা থাকতে দেয়নি কিন্তু মহানায়ক হয়তো চলে গিয়েছিলেন এক গভীর একাকিত্ব নিয়েই। কখনও কখনও একজন মানুষ একটি যুগের প্রতীক হয়ে ওঠেন। উত্তম কুমার সেই প্রতীক। তবু তাঁর মৃত্যুর ৪৬ বছর পরেও প্রশ্নটি থেকে যায়, মহানায়ক কি সত্যিই জানতেন তিনি মৃত্যু পথযাত্রী? নাকি তিনি শুধু জীবনের এক ধ্রুব সত্য বুঝে গিয়েছিলেন, যা আমরা বুঝতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছি।
মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্তও কিছু মানুষ সেই একাকিত্ব বয়ান করতে পারেন না। তাঁরা শুধু বলে যান,“ভালো লাগছে না…”, তারপর একদিন সত্যিই সব ছেড়ে বহু দূরে চলে যান। শুধু পিছনে রেখে যান এক বিশাল শূন্যতা, যার নাম
উত্তম কুমার


