Aaj India Desk, শিলিগুড়ি: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে (Assembly Election) রাজ্যে সরকার বদলের পর শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল (TMC) শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবার বাংলার ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি (BJP)। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বুধবার প্রথমবার উত্তরবঙ্গ সফরে গেলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। আর সেই সফর ঘিরেই সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গজুড়ে ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও রাজনৈতিক চর্চা।
বুধবার সকালে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছতেই হাজার হাজার বিজেপি কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানায়। শুভেন্দুও হাতজোড় করে সকলকে অভিবাদন জানান এবং বলেন, বছরের পর বছর উত্তরবঙ্গের মানুষ বিজেপির পাশে থেকেছেন, তাই এবার তাঁদের জন্য কাজ করার পালা। দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে পাশে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “উত্তরবঙ্গ আর কোনওভাবেই বঞ্চিত থাকবে না। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে পূরণ করা হবে।”
এই সফরে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথাও ঘোষণা করেন। জানানো হয়, এবার থেকে প্রতি মাসে মুখ্যমন্ত্রী নিজে উত্তরবঙ্গ সফরে আসবেন। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন উত্তরকন্যায় বসবেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বলেন, তাঁরা এখানে ঘুরতে নয়, মানুষের কাজ করতে আসবেন। সাধারণ মানুষের সমস্যা সরাসরি শুনতে উত্তরবঙ্গের মন্ত্রীরা নিয়মিত ‘জনতা দর্শন’ কর্মসূচিও করবেন।
বাগডোগরা থেকে সরাসরি উত্তরকন্যায় গিয়ে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার প্রশাসনিক আধিকারিক, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর যোগ দেয়া হয়েছে-
১. বর্ষার আগে বন্যা, ধস, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও জোর দেওয়া হয়।
২. বৈঠকে বেআইনি নির্মাণ, সরকারি জমি দখল এবং নদী থেকে অবৈধ বালি-পাথর তোলার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসনকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করার বার্তাও দেওয়া হয়।
৩. উত্তরবঙ্গে একটি AIIMS, একটি IIT এবং আধুনিক ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্পগুলোর কাজ কতদূর এগোচ্ছে, তা সাধারণ মানুষ যাতে দেখতে পারেন, তার জন্য অনলাইন ট্র্যাকার চালুর কথাও বলা হয়েছে।
৪. চা বাগানের শ্রমিকদের সমস্যা, পাহাড়ি এলাকার উন্নয়ন এবং গ্রামীণ পরিকাঠামো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। পাশাপাশি পাহাড়ে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫. এই সফরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা ছিল ‘জিটিএ’ (GTA) দুর্নীতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া অবস্থান। তিনি জানান, জিটিএ-র পুরনো সব ফাইল খতিয়ে দেখা হবে। দুর্নীতির অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে তথ্য মিলবে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকও একাধিক প্রকল্পের ফাইলে অসঙ্গতি পাওয়ার কথা তুলে ধরেন।
শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, অতীতে পাহাড় ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি হয়েছে, এবার সেই পরিবেশ বদলাতে হবে। মানুষের সমস্যা ও পরামর্শ সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানান তিনি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি নতুন সরকারের পক্ষ থেকে সৌজন্যের বার্তা।
দিনের শেষে শিলিগুড়িতে একটি উড়ালপুল উদ্বোধন করে কলকাতায় ফেরেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে তাঁর এই প্রথম উত্তরবঙ্গ সফর, মাসে মাসে এসে কাজের তদারকি করার আশ্বাস এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা- সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।


