30 C
Kolkata
Saturday, August 22, 2026
spot_img

৯২ লক্ষ অযোগ্য, খরচ ৯,৬০৫ কোটি! ‘লড়কি বহিন’-এর ভুল থেকে অন্নপূর্ণায় কী শিক্ষা নেবে বাংলা?

Aaj India Desk, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ (Annapurna Bhandar) প্রকল্পের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক মহিলার দাবি, আবেদন করার পর প্রয়োজনীয় যাচাইও শেষ হয়েছে, তবু তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে (Bank Account) টাকা ঢোকেনি। এই অভিযোগে কোথাও বিডিও অফিস ঘেরাও, কোথাও রাস্তা বা রেল অবরোধের মতো প্রতিবাদও হয়েছে। একইসঙ্গে অভিযোগ উঠছে, প্রকৃত দরিদ্রদের বদলে তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের নামও তালিকায় চলে এসেছে।

 

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মহারাষ্ট্রের ‘মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লড়কি বহিন যোজনা’ নিয়ে সামনে আসা একটি তথ্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা বাছাই ও যাচাই ব্যবস্থা নিয়ে। তথ্যের অধিকার আইনে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই প্রকল্পে প্রায় ৯২ লক্ষ অযোগ্য উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে মোট ৯,৬০৫ কোটি টাকা চলে গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে কেন ক্ষোভ?

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে যোগ্য মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে দেওয়ার কথা। কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক আবেদনকারী অভিযোগ করছেন, সমস্ত শর্ত পূরণ করার পরেও তাঁরা টাকা পাচ্ছেন না।

ফারাক্কা, সাগরদিঘি, ধুলিয়ান, বিরাটি, রাজপুর-সোনারপুর-সহ একাধিক এলাকায় এই নিয়ে বিক্ষোভের খবর এসেছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গাতেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্র মহিলাদের নাম বাদ পড়ছে, অথচ আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা সুবিধা পাচ্ছেন। কোথাও আবার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও উঠেছে।

রাজ্য সরকারের (West Bengal Government) তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা মাসে ৩,০০০ টাকা করে পাচ্ছেন। প্রায় ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১৪ লক্ষ আবেদন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। বাতিল হওয়া আবেদনকারীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ দিতে ‘ক্লেম অ্যান্ড অবজেকশন’ পোর্টাল চালুর কথাও জানানো হয়েছে।

কী এই ‘লড়কি বহিন’ প্রকল্প?

মহারাষ্ট্রে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সরকার ‘মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লড়কি বহিন যোজনা’ চালু করে। আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়াই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে মহাযুতি জোটের সাফল্যের পিছনে এই প্রকল্পের ভূমিকা ছিল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করে। তবে প্রকল্প চালুর পর থেকেই এর বিপুল আর্থিক ব্যয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এবার আরটিআই-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

৯২ লক্ষ অযোগ্য উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে ৯,৬০৫ কোটি!

আরটিআই-তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৯২ লক্ষ অযোগ্য উপভোক্তা এই প্রকল্পের টাকা পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৯,৬০৫ কোটি টাকা পাঠানো হয়েছে। পরে যাচাই করে তাঁদের অনেকের নাম উপভোক্তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

যাঁদের অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬২ লক্ষ ব্যক্তি ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করেননি। প্রায় ১৬ লক্ষ পরিবারের বার্ষিক আয় নির্ধারিত ২.৫ লক্ষ টাকার সীমার বেশি ছিল। প্রায় ৩ লক্ষ ৬০ হাজার উপভোক্তা আগে থেকেই সঞ্জয় গান্ধী নিরাধার অনুদান যোজনার সুবিধা নিচ্ছিলেন।

এছাড়াও প্রায় ২.৫ লক্ষ ক্ষেত্রে একই পরিবারের অন্য একজন সদস্যও প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করেছিলেন। প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার উপভোক্তার বয়স প্রকল্পের নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৬৫ বছরের বেশি ছিল।

এর পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ সরকারি কর্মী ও আধিকারিকও প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছিলেন বলে তথ্য সামনে এসেছে। জেলা স্তরের যাচাইয়ে আরও প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার ব্যক্তিকে অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, একাধিক দফায় তালিকা যাচাই ও সংশোধন করা হলেও অযোগ্য উপভোক্তাদের পুরোপুরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

প্রতি মাসে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা বেশি খরচ

মহারাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লক্ষ ৭০ হাজার মহিলা এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য বলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে টানা ১৭ মাস টাকা পাঠানো হয়েছিল।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে উপভোক্তার সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৪৭ লক্ষ ২০ হাজারে পৌঁছয়। এর ফলে প্রতি মাসে প্রকল্পের খরচ ৩,৬৪০ কোটি টাকার বেশি হয়েছিল।

যোগ্য উপভোক্তার সংখ্যা অনুযায়ী মাসিক খরচ হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২,৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, কয়েক মাসে প্রতি মাসে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে বলে হিসাব থেকে উঠে এসেছে।

গত ২৪ মাসে ‘লড়কি বহিন’ প্রকল্পে মহারাষ্ট্র সরকারের মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৭৬,২৬১ কোটি টাকা। এই সময়ে প্রায় ৩৯ কোটি ৭৫ লক্ষ ৮০ হাজার পেমেন্ট এন্ট্রি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি ১০ লক্ষ এন্ট্রি।

অর্থাৎ, ৬ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি অতিরিক্ত পেমেন্ট এন্ট্রি হয়েছে। আরটিআই তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত পেমেন্টের মাধ্যমেই অযোগ্য উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯,৬০৫ কোটি টাকা চলে গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

টাকা কি ফেরত নেওয়া হবে?

এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। মহারাষ্ট্র সরকার অধিকাংশ অযোগ্য উপভোক্তার কাছ থেকে টাকা ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে সরকারি সূত্রের দাবি।

তবে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ সরকারি কর্মী ও আধিকারিক প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ায় তাঁদের কাছ থেকে টাকা ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য জেলা প্রশাসনগুলিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতির রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আয়সীমা পেরিয়ে যাওয়া, বয়সের শর্ত পূরণ না করা কিংবা একই পরিবারের একাধিক সদস্যের সুবিধা নেওয়ার মতো ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে দেওয়া টাকা ফেরত নেওয়া হবে না বলে জানা গিয়েছে।

বাংলার জন্য কী শিক্ষা?

মহারাষ্ট্রের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে—এমন কোনও প্রমাণ নয়। তবে এই ঘটনা সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে উপভোক্তার তালিকা তৈরির সময় কঠোর যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট করে। একদিকে অযোগ্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে সরকারি টাকা চলে গেলে রাজকোষের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অন্যদিকে, তালিকায় ভুল থাকলে প্রকৃত যোগ্য মানুষ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বাদ পড়তে পারেন।

পশ্চিমবঙ্গে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার নিয়ে যখন একাধিক জায়গায় টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠছে, তখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল—যোগ্য মহিলাদের দ্রুত সুবিধার আওতায় আনা এবং তালিকায় থাকা অযোগ্যদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা।

মহারাষ্ট্রের প্রায় ৯,৬০৫ কোটি টাকার অভিজ্ঞতা তাই বাংলার জন্য সরাসরি তুলনা নয়, বরং সরকারি প্রকল্পের তালিকা যাচাই ও অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখন নজর থাকবে, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের আবেদন যাচাই এবং ‘ক্লেম অ্যান্ড অবজেকশন’ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন