SPECIAL FEATURE
“তুই তো ৯০% পেয়েছিস, তুই আর্টস নিবি কেন?” প্রতি বছর ফল বেরোনোর পর এই একটাই প্রশ্ন ভারতের লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীকে শুনতে হয়। আর এই একটাই প্রশ্ন অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর নিজের পছন্দ, স্বপ্ন আর আগ্রহকে চুপ করিয়ে দেয়। ভালো নম্বর পেলেই সাইন্স নিতে হবে-এমনই এক অদ্ভুত চাপ আজও সমাজের বড় অংশে কাজ করে। আর সেই চাপেই অনেক ছেলে-মেয়ে নিজের পছন্দের বিষয় ছেড়ে, নিজের প্যাশনকে গলা টিপে মেরে শুধুমাত্র লোকের কথায় অন্য রাস্তা বেছে নেয়।
আমাদের সমাজে এখনও অনেকেই ভাবেন যে-অংকে ভালো মানেই, সেই জিনিয়াস। আর যে ইতিহাস, সাহিত্য বা সমাজবিজ্ঞানটটা ভালো বোঝে, সে সাধারণ মানের ছাত্র। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাস্তবটা কি সত্যিই এমন?
আমরা ইচ্ছে করে অনেকেই বুঝতে চাই না যে, বুদ্ধি শুধু অংকে থাকে না। কেউ অংকে ভালো, কেউ লেখায় ভালো, কেউ মানুষের সঙ্গে ভালো কথা বলতে পারে, কেউ নতুন নতুন দারুন আইডিয়া দিতে পারে, কেউ সমাজকে ভালো বোঝে। এগুলোও সমান বড় গুণ।
তাই এইবার অন্তত কিছু অভিভাবকদের বোঝা উচিত শুধুমাত্র সাবজেক্টের ওপর ভিত্তি করে ছাত্র-ছাত্রীর মেধাকে তুলনা না করে আসল বুদ্ধিমত্তার মানেটা কি সেটা বোঝা।
সাইন্স নিলেই সাফল্য?
অনেকেই ভাবে সাইন্স নিলেই জীবন সেট। কিন্তু বাস্তব এখন অন্য কথা বলছে। Unstop Talent Report 2025 অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮৩ শতাংশ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা ছাত্র-ছাত্রী বেকার বা কোনও ইন্টার্নশিপ ছাড়া বাড়িতে বসে আছে। এর মানেই কিন্তু সাইন্স খারাপ নয়। এর মানে শুধু সবাই সাইন্স নিচ্ছে বলে আমিও সাইন্স নেব এই মনোভাব থাকাটা। আমাদের বুঝতে হবে নিজের ইচ্ছা, যোগ্যতা আর আগ্রহ না থাকলে কোনও বিষয়ই কাজে লাগে না।
বাড়ির চাপ আছে, আত্মীয় বলছে, বন্ধুরা নিচ্ছে, বা শুনেছে এতে টাকা বেশি-আজকাল অনেক ছাত্র-ছাত্রীর সাইন্স নেয়ার কারণ শুধু এগুলোই। কিন্তু শুধু ভিড়ের সঙ্গে গেলে সবাই কি সফল হয়? উত্তরটা হল, না। তখন মানুষ নিজের স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে।
সব বিষয়েরই দাম আছে
সাইন্স আমাদের শেখায় লজিক, নতুন কিছু ভাবনা চিন্তা করার কথা, নতুন কিছু আবিষ্কার করার কথা। আর আর্টস শেখায় মানুষকে বোঝা, সমাজকে চেনা, ইতিহাস জানা, অর্থনীতি বোঝা। এবং কমার্স শেখায় হিসাব, ব্যবসা আর পরিকল্পনা।
একটা দেশ চালাতে যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার লাগে, তেমনই শিক্ষক, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, প্রশাসক, লেখক-সবাইকেই দরকার। তাই কোনও বিষয়ই ছোট নয়।
আর একটা ভুল কথা খুব শোনা যায়-সাইন্স কঠিন, আর্টস সহজ। আসলে এটা পুরোটাই ভুল ধারণা নয় কি? কারণ যার অংক ভালো লাগে তার কাছে সাইন্স সহজ। যার পড়তে, লিখতে, বুঝতে ভালো লাগে তার কাছে আর্টস সহজ। প্রত্যেক বিষয়ের আলাদা চাপ আছে, আলাদা কষ্টও আছে।
আর আপনাদের এটাও জানা দরকার যে বড় বড় বিজ্ঞানীরাও সেই একই কথা বলছে। Harvard-এর মনোবিজ্ঞানী Howard Gardner বলেছিলেন, সব মানুষের বুদ্ধি একরকম হয় না, বুদ্ধি মানুষ বিশেষে অন্যরকম হয়। যে ছেলে কঠিন ক্যালকুলাস পারে সে যেমন বুদ্ধিমান, ঠিক তেমনই যে মেয়ে দারুণ গল্প লেখে বা সুন্দর পরিকল্পনা করতে পারে, সেও সমান বুদ্ধিমান।
নিজের পছন্দটাই আসল
ভালো নম্বর পেলেই এমন বিষয় নেওয়া উচিত নয়, যেটা পড়তে বসলে মাথা ধরবে। আবার কম নম্বর পেয়েছ বলে নিজের ইচ্ছা ছেড়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সবসময় মনে রাখবে সমাজ তোমাকে গাছে তুলতে চাইবে, কিন্তু তোমার যদি ডানা থাকে তবে কি তোমার সেই গাছে ওঠার প্রয়োজন আছে? তুমি যদি তোমার নিজের পথ খুব ভালো করেই জানো তাহলে তোমাকে অন্যের দেখানো পথে চলতে হবে এমন তো কোন মানে নেই কিন্তু।
কারণ একমাত্র তুমি নিজেই ভালো জানবে যে কোন বিষয়টা পড়তে তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, কোনটা বুঝতে সুবিধা হয়, আর কোনটা পড়লে চাপ লাগে। তাই সিদ্ধান্তটা তোমার নিজের হওয়া উচিত, বাড়ির লোকের নয় নয়।
World Economic Forum-এর Future of Jobs Report 2025 বলছে, আগামী দিনে শুধু ক্যালকুলেশন বা কোডিং জানলেই হবে না। কারণ এগুলোর অনেক কাজ AI করে দেবে। তখন দরকার হবে Analytical Thinking, Creativity, Problem Solving আর মানসিক শক্তির। এই গুণগুলো সাইন্স, আর্টস, কমার্স-সব জায়গা থেকেই শেখা যায়।
তাই দিনশেষে তুমি কোন স্ট্রিম নিলে সেটা বড় কথা নয়। তুমি যা নিলে সেটা কতটা মন দিয়ে শিখলে, কতটা ভালো হলে, সেটাই বড় কথা। আর আমাদের আসল লড়াই Science vs Arts নয়। আসল লড়াই Interest vs Pressure।
তুমি তবেই সাইন্স নাও যদি সত্যিই সেটা তোমার ভালো লাগে। আর আর্টস নাও যদি তোমার মানুষ, সমাজ, ইতিহাস বুঝতে ভালো লাগে। কারণ সবসময় মনে রাখবে, তোমার পরিচয় তোমার সাবজেক্ট না। তোমার পরিচয়ই তোমার কাজ।
(পূরবী প্রামাণিক )


