Aaj India Desk, কলকাতা: তৃণমূল (TMC) সরকারের আমলে পঞ্চায়েত নির্বাচন (Panchayat Election) থেকে শুরু করে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করত বলে অভিযোগ করেছেন প্রাক্তন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। এক সাক্ষাৎকারে ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার এবং শাসক দলের তরফে বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা তিনি দেখেছিলেন।
এবার রাজীব সিনহার বক্তব্যের সঙ্গে অনেকটাই সুর মিলিয়েছেন দীর্ঘদিন রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার দেবাশিস সেন (Debasis Sen)। তাঁর দাবি, প্রশাসনে যোগ্যতার পাশাপাশি শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। কাছের মানুষ না হলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে দূরে রাখা হত বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
একসময় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দায়িত্ব সামলানো দেবাশিস সেনের বক্তব্য, প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত। তাঁর মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি তৈরি করবে, কিন্তু সেই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমলাদের পেশাদারিত্ব বজায় থাকা জরুরি। বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে সেই সীমারেখা অনেকটাই দুর্বল হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
তবে রাজনৈতিক চাপ থাকলেও একজন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন বলেও উল্লেখ করেছেন দেবাশিস সেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রাক্তন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মীরা পাণ্ডের উদাহরণ দেন। তাঁর বক্তব্য, মীরা পাণ্ডে রাজ্য সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এবং সেখানেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ থাকলেও আইনি পথে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেই মত তাঁর।
আমলাদের উপর রাজনৈতিক চাপ কীভাবে তৈরি হয়, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেবাশিস সেনের বক্তব্য, এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হল বদলি এবং পদায়ন। নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, কোনও নির্দিষ্ট অফিসারকে কোনও পদে না রাখার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও তিনি দেখেছেন।
শুধু বদলি-পদায়ন নয়, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। নিজের কর্মজীবনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে দেবাশিস সেন জানান, মুখ্যসচিব হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সুযোগ তৈরি হলেও অবসরের সময় ঘনিয়ে আসার যুক্তি দেখিয়ে তাঁকে সেই পদ দেওয়া হয়নি।
একইসঙ্গে অত্রি ভট্টাচার্যের নামও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, অত্যন্ত দক্ষ অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেবাশিস সেনের বক্তব্য, প্রশাসনে নিজের অবস্থান বা সততা বজায় রেখে কাজ করতে গেলে অনেক সময় তার মূল্য দিতে হয়। সেই মূল্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়া বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ নিয়েও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন প্রাক্তন এই আমলা। তাঁর দাবি, বিশেষ করে পুলিশ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সময় অনেক ক্ষেত্রেই কোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা থাকত না। সরাসরি তালিকা আসত এবং সেই অনুযায়ী নিয়োগের জন্য প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করা হত বলে অভিযোগ তাঁর।
তাঁর আরও দাবি, এই ধরনের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের চাকরির মেয়াদ এবং অবসরের পর আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি ধীরে ধীরে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার রূপ পেয়েছিল বলে মনে করেন তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের একাংশকে নবান্নে পরামর্শদাতা হিসেবে রাখার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন দেবাশিস সেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন জেলায় কোন অফিসার কীভাবে কাজ করছেন, কোথায় কাকে রাখা হবে বা কোন অফিসারকে কী দায়িত্ব দেওয়া হবে—এসব বিষয়েও নেপথ্য থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলত। তাঁর দাবি, শাসক দলের কাছে কোন অফিসার ‘ঘনিষ্ঠ’ বা ‘বিশ্বস্ত’, সেই মূল্যায়নেও এই পরামর্শদাতাদের ভূমিকা ছিল।
প্রশাসনের সঙ্গে রাজনীতির এই সম্পর্কের প্রসঙ্গে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজীব কুমারের ঘটনাও সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁদের নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত তৈরি হয়েছিল। পরে রাজীব কুমার অবসর নেওয়ার পর তৃণমূলের তরফে রাজ্যসভায় পাঠানো হয় তাঁকে। অন্যদিকে মুখ্যসচিব পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ও মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সব মিলিয়ে রাজীবা সিনহা এবং দেবাশিস সেনের বক্তব্যে তৃণমূল সরকারের সময় প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক প্রভাব, বদলি-পদায়ন, নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আমলাদের বসানো নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁদের বক্তব্য ঘিরে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আমলাতন্ত্রের স্বাধীনতা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে।


