Aaj lndia Desk,মুর্শিদাবাদ : মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বড়ুয়ার ফরাজিপাড়া গ্রামে ইকবাল হোসেনের জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকার ঘটনা সামনে আসার পর নতুন করে উঠে এল আরও তিন তরুণীর কথা। ইকবালের জেঠতুতো দিদি-বোন তৌফিকা পারভিন, নাসরিন সুলতানা এবং তানিয়া সুলতানারও একই রকম সমস্যা। শরীরে অসহ্য জ্বালা অনুভূত হলে তাঁরা দীর্ঘ সময় পুকুরের জলে ডুবে থাকেন। চিকিৎসার অভাবে তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাঁদের মা গুলশন বেওয়া।
শরীরে জ্বালা, জলে নামলেই স্বস্তি
৪২ বছরের গুলশন জানান, তিন মেয়েরই বয়স ১০-১২ বছর হওয়ার পর থেকে শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তিনি। ধীরে ধীরে তাঁদের ওজন বাড়তে থাকে। বর্তমানে তিনজনেরই ওজন ১০০ কিলোগ্রামের বেশি। শরীরে জ্বালা শুরু হলে তাঁরা বারবার স্নান করেন, এমনকি সকাল থেকে দীর্ঘ সময় পুকুরের জলে থাকেন। কখনও অন্ধকার নেমে গেলেও জল থেকে উঠতে চান না।
শ্বাসকষ্টেও ভোগেন তিন বোন
গুলশনের দাবি, ঠান্ডা জল পান করার প্রবণতা এবং বারবার জলে থাকার কারণে মেয়েদের শ্বাসকষ্টও হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে ইঞ্জেকশন ও অক্সিজেন দেওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি মেলে। কিন্তু নিয়মিত চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের নেই।
পড়াশোনাও থেমে গিয়েছে
তিন মেয়েকেই স্কুলে ভর্তি করেছিলেন গুলশন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে কারও পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। ২২ বছরের তৌফিকা মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ে আর এগোতে পারেননি। ১৮ বছরের নাসরিন অষ্টম শ্রেণির পর স্কুল ছেড়েছেন। ১৬ বছরের তানিয়া ক্লাস টু-এর পরেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।
দৈনন্দিন কাজও করতে পারেন না
শরীরের অসহ্য জ্বালা ও অতিরিক্ত ওজনের কারণে তিন বোনের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত। রান্না কিংবা বাড়ির অন্যান্য কাজও করতে পারেন না তাঁরা। তৌফিকার কথায়, জলে থাকলে বা স্নান করলেই কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। তাই অসুস্থ অবস্থায় মায়ের উপার্জনের উপরই নির্ভর করতে হয় তাঁদের।
রাতেও পুকুরে যাওয়ার চেষ্টা
পরিবারের সদস্য নাসিমা খাতুন জানান, কখনও কখনও রাতের অন্ধকারেও তিন বোন পুকুরে গিয়ে জলে ডুবে থাকতে চান। সেই কারণে তাঁদের মা বাড়ির বারান্দায় গ্রিল লাগিয়ে তালাবন্ধ করে রাখেন, যাতে তাঁরা আচমকা বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারেন।
মাসে মাত্র ৩ হাজার টাকার আয়
গুলশন একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় পরিচারিকার কাজ করেন। মাসে তাঁর আয় মাত্র ৩ হাজার টাকা। আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের সাহায্য নিয়ে কোনওরকমে সংসার চালান তিনি। এই অবস্থায় তিন মেয়ের চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
বংশগত অসুখের আশঙ্কা
পরিবারের ইতিহাসেও রয়েছে একই ধরনের সমস্যার ইঙ্গিত। গুলশনের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের দাদু মুস্তাফা শেখেরও একটা সময় অস্বাভাবিক ভাবে ওজন বেড়ে গিয়েছিল। তাঁর দুই ছেলে মুরসালিম ও হাসিবুলের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। তিনজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং অকালেই মারা যান।
মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অনাদি রায়চৌধুরীর মতে, প্রাথমিক ভাবে বিষয়টি বংশগত অসুখ বলে মনে হতে পারে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। হাসপাতালে নিয়ে এলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
মানসিক সমস্যার যোগও দেখছেন বিশেষজ্ঞ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রঞ্জন ভট্টাচার্যের মতে, অতিরিক্ত ওজনের কারণে দীর্ঘদিন ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হলে গভীর মানসিক অবসাদ তৈরি হতে পারে। সেই মানসিক কষ্ট শরীরে জ্বালা বা ব্যথার অনুভূতি হিসেবেও প্রকাশ পেতে পারে, যাকে ‘সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার’-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তাঁর মতে, দীর্ঘক্ষণ জলে থাকায় কিছুটা শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি পেতে পারেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞের আরও বক্তব্য, স্থূলতার সঙ্গে হরমোনজনিত সমস্যা থাকতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দিনের পর দিন জলে থাকার ফলে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগও দেখা দিতে পারে। তাই দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।
ইকবালের মতো চিকিৎসা কি মিলবে?
ইকবালের জলে ভেসে থাকার ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই গ্রামের তৌফিকা, নাসরিন ও তানিয়ারা সেই সুযোগ পাননি। স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, একই ধরনের সমস্যায় ভোগা এই তিন বোনের চিকিৎসার দায়িত্বও কি কেউ নেবেন? পরিবারের আশা, তাঁদের সমস্যার কথাও এবার সামনে আসবে এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে।


