SPECIAL FEATURE
আমাদের দেশে সাধারণত এমনটাই ঘটে যে, একজন ভোটার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকেই সমর্থন করেন না। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের জন্য ‘উপরের কোনোটিই নয়’ বা NOTA (None of the Above) একটি ব্যতিক্রমী ও আলোচিত সংযোজন। এটি এমন একটি বিকল্প, যেখানে একজন ভোটার কোনো প্রার্থীকে পছন্দ না করলেও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। অর্থাৎ, “আমি ভোট দিচ্ছি, কিন্তু কাউকেই সমর্থন করছি না” এই বার্তাটিই NOTA- বহণ করছে।
‘উপরের কোনোটিই নয়’ এই ব্যালট বিকল্পের ধারণাটির উদ্ভব ঘটে ১৯৭৬ সালে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সান্তা বারবারা কাউন্টির আইলা প্রসপেক্ট মিউনিসিপ্যাল ইনফর্মেটিভ কাউন্সিল সরকারি নির্বাচনী ব্যালটে এই বিকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি প্রস্তাব পাস করে।ভারতে, ২০০৯ সালে, ভারত কমিটি সুপ্রিম কোর্টের কাছে ব্যালটে ভোটারদের জন্য ‘উপরের কোনটিই নয়’ বিকল্পটি রাখার আবেদন জানায়, কারণ এটি ভোটারদের কোনো অযোগ্য প্রার্থীকে বেছে না নেওয়ার স্বাধীনতা দেবে।
সরকার এই ধরনের ধারণার পক্ষে ছিল না। দ্য পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ নামক একটি সংগঠন NOTA-এর পক্ষে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে। অবশেষে, ২০১৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘উপরের কোনটিই নয়’ বিকল্পটি বেছে নেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করে এবং কমিটিকে নির্দেশ দেয় যে প্রতিটি ভোট মেশিনে একটি NOTA বোতাম সরবরাহ করতে হবে যার ফলে ভোটারদের ‘উপরের কোনটিই নয়’ বিকল্পটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court )-র নির্দেশে ইভিএমে NOTA বোতাম যুক্ত হওয়ার পর থেকেই এটি ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় এই ব্যবস্থা কি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে, নাকি এটি শুধুই একটি প্রতীকী প্রতিবাদের সীমাবদ্ধ মাধ্যম?
NOTA-এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য
NOTA আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের অধিকার আরও বিস্তৃত করা। আগে অনেক ভোটার কোনো প্রার্থীকে পছন্দ না করলেও ভোট দিতে বাধ্য হতেন অথবা ভোট বর্জন করতেন। এতে তাদের মতামত প্রতিফলিত হতো না। সুপ্রিম কোর্টের মতে, একজন নাগরিকের অধিকার থাকা উচিত যেন তিনি খারাপ, অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থীদের প্রতি সরাসরি অসম্মতি জানাতে পারেন। NOTA সেই সুযোগই তৈরি করে দেয়।
তাত্ত্বিকভাবে এর লক্ষ্য ছিল
1. রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপ দেওয়া যাতে তারা ভালো প্রার্থী দেয়
2. ভোটারদের “নীরব অসন্তোষ”প্রকাশের সুযোগ দেওয়া
3. গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়ানো
NOTA বনাম পুরনো 49-O ব্যবস্থা
NOTA চালুর আগে একটি ব্যবস্থা ছিল 49-O। সেখানে ভোটার ভোট দিতে অস্বীকার করলে তার নাম রেকর্ড করতে হতো এবং পোলিং অফিসারকে জানাতে হতো তিনি কাউকে ভোট দিচ্ছেন না।এই ব্যবস্থার বড় সমস্যা ছিল গোপনীয়তার অভাব। ভোটারদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত প্রবল , যা গণতান্ত্রিক গোপন ভোটাধিকাকে লঙ্ঘন করতো।
NOTA এই সমস্যার সমাধান করে
1. এটি সম্পূর্ণ গোপন
2. ভোটারের পরিচয় প্রকাশ পায় না
3. কোনো কারণ ব্যাখ্যা করতে হয় না
বাস্তব প্রভাব: আদৌ কি কিছু বদলেছে?
সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। বাস্তবে NOTA-এর ভোট গণনা করা হলেও এটি নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করে না।যদি কোনো নির্বাচনে NOTA সর্বাধিক ভোটও পায়, তবুও সর্বাধিক বৈধ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীই জয়ী ঘোষণা হন এতে অনেক বিশ্লেষক বলেন, NOTA একটি “প্রতিবাদের প্রতীক”, কিন্তু “ক্ষমতা পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়”।
রাজনৈতিক দলে চাপ সৃষ্টি হয়েছে কি?
একাংশ দাবি করছে, NOTA রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নৈতিক চাপ তৈরি করে। কারণ বেশি NOTA ভোট মানে জনগণের অসন্তোষ , দলগুলোকে প্রার্থী বাছাইয়ে সতর্ক হতে হয় পাশাপাশি দুর্নীতিগ্রস্ত বা অযোগ্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বার্তা যায় , কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বহু নির্বাচনে NOTA ভোট বাড়লেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী নির্বাচনের ধরণে বড় পরিবর্তন খুব বেশি দেখা যায়নি ।
তবে NOTA-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো এর “নির্বাচনী ওজনহীনতা”।অর্থাৎ ভোটার মত প্রকাশ করলেও ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে না এটি ভোটারকে ভালোর বদলে খারাপকে বেছে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করতে পারে না এখন ও পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোনো বাস্তব পথ তৈরি করে না , তাই অনেকেই একে “symbolic protest only”বলে অভিহিত করেন।
ধরুন যদি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে NOTA সর্বাধিক ভোট পায়, তাহলে কি হবে ?
ভারতীয় নিয়ম কি বলছে জানেন ..? NOTA সর্বাধিক ভোট পেলেও সেই আসন শূন্য ঘোষণা না করা হলেও যে প্রার্থী NOTA ছাড়া সর্বাধিক বৈধ ভোট পায়, তিনিই বিজয়ী হন অর্থাৎ, NOTA-র ভোট গণনা করা হয় ঠিকই কিন্তু বিজয়ী হয় অন্য কেউ অনেক ক্ষেত্রে সেই নির্বাচনের ফল বহাল ও থাকে , যদিও পুনর্নির্বাচনের কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই তবে কিছু প্রস্তাব থাকলেও বাস্তবে কার্যকর নয় ।অর্থাৎ, NOTA জয়ী হলেও কেউ জিতে যায় এটাই এর সবচেয়ে বড় বিতর্ক।
কিছু দেশ, যারা শুরুতে ভোটারদের জন্য এমন বিকল্প চালু করেছিল, পরে সেই ব্যবস্থাটি বাতিল বা বিলুপ্ত করে দেয়। যেসব দেশে ব্যালটিং মেশিনে একটি NOTA বোতাম থাকে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে নির্বাচনে “জয়ী” হওয়ার সম্ভাবনা একক থাকে। এমন ক্ষেত্রে, কমিশন নিম্নলিখিত বিকল্পগুলির যেকোনো একটি বেছে নিতে পারে: ১) পদটি খালি রাখা, ২) নিয়োগের মাধ্যমে পদটি পূরণ করা, এবং ৩) আরেকটি নির্বাচন আয়োজন করা। এই পরিস্থিতিতে, মার্কিন রাষ্ট্র এমন একটি নীতি গ্রহণ করে যেখানে কারও উপর কোনো প্রভাব পড়ে না এবং ফলস্বরূপ, পরবর্তী সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত পক্ষই জয়ী হয়।
শেষ কথা: গণতন্ত্রকে বদলাবে নাকি শুধু “চাপা ক্ষোভ”?
NOTA নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন আজও একই রয়ে গেছে এটি কি সত্যিই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বদলাতে পারছে?নাকি এটি শুধু ভোটারদের অসন্তোষ প্রকাশের একটি সীমাবদ্ধ দরজা?একদিকে এটি ভোটারদের কণ্ঠস্বরকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে সেই কণ্ঠস্বরের কোনো সিদ্ধান্তমূলক শক্তি নেই।এই দ্বন্দ্বের কারণেই NOTA আজও ভারতের গণতন্ত্রে একটি অর্ধ-সম্পূর্ণ সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে যার প্রভাব আছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই।
(সুরভী কুণ্ডু)


