Aaj India Desk, হুগলি: সরকার বদলেছে। একের পর এক প্রকল্পের নাম বদলাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় ও দলীয় অফিসের রংও বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের একাংশের প্রশ্ন, শিক্ষা ব্যবস্থার যে দীর্ঘদিনের সংকট, তার সমাধান কি একই গতিতে হচ্ছে? আরামবাগ মহকুমার আটটি জুনিয়র হাইস্কুলে তালা পড়ার ঘটনাকে ঘিরে ফের সেই প্রশ্নই জোরালো হয়েছে।
অভিযোগ, দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ কার্যত থমকে থাকায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। তারই চরম পরিণতি দেখা গেল হুগলির আরামবাগ মহকুমায়। স্কুল ভবন রয়েছে, শ্রেণিকক্ষ রয়েছে, পরিকাঠামোও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ছাত্রছাত্রীও রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা না থাকায় একের পর এক স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন সেই স্কুলগুলির অনেকগুলিই কার্যত তালাবন্দি। কোথাও ভবন অব্যবহৃত, কোথাও আবার স্থানীয়রা অন্য কাজে ব্যবহার করছেন।
স্কুল শিক্ষা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আরামবাগ মহকুমার চুনাইট জুনিয়র হাইস্কুল, নারায়ণপুর জুনিয়র হাইস্কুল, গোঘাটের পাণ্ডুগ্রাম বেনেপুকুর শিবতলা জুনিয়র হাইস্কুল, খানাকুলের শশাপোতা হরিজন নিম্ন বুনিয়াদ বিদ্যালয়, বামনখানা বিবেকানন্দ জুনিয়র হাইস্কুল, জগৎপুর জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল, রাংতাখালি জুনিয়র হাইস্কুল এবং মাদারিচক জুনিয়র হাইস্কুল এই আটটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্যে নেমে আসায় স্কুল কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এই স্কুলগুলিতে আর নিয়মিত পঠনপাঠন হচ্ছে না।
ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে গ্রামের পড়ুয়ারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের বর্ষার জল-কাদা মাড়িয়ে দূরের স্কুলে যেতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই যাতায়াতের সমস্যার কারণে উপস্থিতিও কমছে। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠছে বলে দাবি বাসিন্দাদের।
গোঘাটের পাণ্ডুগ্রামের বাসিন্দা সুজয় রায় বলেন, “গ্রামে স্কুলের বিল্ডিং আছে। ছাত্রছাত্রীরাও আছে। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই। এতেই চরম সমস্যায় পড়েছে বহু ছাত্রছাত্রী। বার বার বলা সত্ত্বেও শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাবে স্কুল বন্ধই হয়ে গিয়েছে।”
খানাকুলের জগৎপুরের বাসিন্দা বাঁশরিমোহন সুর-এর অভিযোগ, “তৃণমূলের আমলে ধীরে ধীরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। যাও বা দু’একজন শিক্ষক ছিলেন, তাঁরাও অন্যত্র চলে যান। শিক্ষা ক্ষেত্রে তৃণমূল কোনও ব্যবস্থাও নেয়নি। ফলে, এ রকম বহু স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।”
একই সুর শোনা যায় খানাকুলের বাসিন্দা বৈদ্যনাথ রায়-এর বক্তব্যেও। তাঁর দাবি, “স্কুলভবন আছে, ছাত্রছাত্রী আছে, কিন্তু পড়ানোর শিক্ষক নেই। ফলে গ্রাম থেকে অনেক দূরের স্কুলে যেতে হচ্ছে। বর্ষাকালে বন্যাকবলিত এলাকার পড়ুয়ারা নিয়মিত স্কুলে যেতেই পারে না।”
অন্যদিকে, আরামবাগের বর্তমান বিধায়ক হেমন্ত বাগ এই পরিস্থিতির জন্য আগের সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “তৃণমূল কোটি কোটি টাকা লুটেছে। শিক্ষক নিয়োগ তো দূরের কথা, নিয়োগে কী ভাবে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে, তা সকলেই দেখেছেন। আমরা কী ভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, তা দেখছি।”
অনেকেই বলছে , বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগ না হওয়াই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। অন্যদিকে, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই নতুন করে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের আশা, দ্রুত পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ হলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা এই স্কুলগুলি আবার চালু হবে এবং গ্রামের পড়ুয়ারা নিজেদের এলাকাতেই শিক্ষার সুযোগ ফিরে পাবে।
তবে এই ঘটনাকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের একাংশ আরও বড় প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রকল্পের নাম পরিবর্তন, রং পরিবর্তন বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলির সমস্যার সমাধানই হওয়া উচিত সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অনেকেই বলছেন, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টাকা কবে কার অ্যাকাউন্টে ঢুকল, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সমান গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ঠিক কতগুলি স্কুল শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে, কতগুলি স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং সেই সমস্যার সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।


