কলকাতা: লালবাজারে পুলিশের জেরা, আর সেখানেই নাকি ফাঁস দাম্পত্যের অন্দরমহলের টানাপড়েন! কোটি কোটি টাকার পুজো পাস দুর্নীতির অভিযোগে জেলবন্দি প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন (Indranil Sen)। তদন্তের জাল ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের ঘিরে। আর সেই তদন্তের মধ্যেই স্বামী-স্ত্রীকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করতে গিয়ে পুলিশের সামনেই শুরু হয়ে গেল বচসা! স্ত্রী মধুছন্দা নাকি সটান বলে উঠলেন, ‘এইভাবে টাকা তুলতে তোমায় অনেকবার বারণ করেছিলাম, শোনোনি!’ পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেন ইন্দ্রনীলও। পুলিশ তখন নীরব দর্শক! অন্তত তদন্ত-ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
কিন্তু প্রশ্ন, ঠিক কী নিয়ে এই দাম্পত্য কলহ? দুর্গাপুজোয় UNESCO-র নাম ও লোগো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কয়েকটি পুজোর পাস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে ইন্দ্রনীল সেন (Indranil Sen) ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের তদন্তেই ইতিমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। এবার পুলিশের নজরে তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা। লালবাজারে টানা দু’দিন তাঁকে জেরা করেছে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT। তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, ‘মাস আর্ট’ বা MassArt-কে কেন্দ্র করে যে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে মধুছন্দার কাছে।
তবে তদন্তের গল্পে এন্ট্রি হয়েছে ইন্দ্রনীল-কন্যা আভেরি সেনেরও! পুলিশ তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আপাতত হাজিরা এড়িয়েছেন তিনি। তদন্তকারীদের নজরে কেন আভেরি? পুলিশের দাবি, সরকারি অনুষ্ঠানের টাকা এবং পাস বিক্রির টাকার কিছু লেনদেন তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেও হয়ে থাকতে পারে।
তদন্তে আরও যে আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে চর্চা। পুলিশের দাবি, ইন্দ্রনীলের (Indranil Sen) ঘনিষ্ঠ সংস্থা ‘থার্ড লাইন ক্রিয়েশন’ MassArt Society-কে ৬৬ লক্ষ টাকা পাঠিয়েছিল। সেই টাকার মধ্যে ২২.৪৭ লক্ষ টাকা যায় ‘আইস্কেপ’ ও ‘মায়রা’ নামে দুটি সংস্থার কাছে। পুলিশের দাবি, ওই সংস্থা দুটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ইন্দ্রনীলের মেয়ে। এই লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, কোথা থেকে টাকা এসেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় খরচ হয়েছে—সেসবই এখন তদন্তের বিষয়।
এদিকে তদন্তে আরও বড় আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে লালবাজার। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দ্রনীলের (Indranil Sen) বিরুদ্ধে ‘মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার’ বা MPO আইনের ২ ও ৯ নম্বর ধারা প্রয়োগের জন্য ব্যাঙ্কশাল আদালতে আবেদন করার কথা ভাবছে পুলিশ। তদন্তকারীদের অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের অর্থের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক হিসেব দিতে পারেননি ইন্দ্রনীল। গান গেয়ে টাকা উপার্জনের দাবি করলেও তার সমর্থনে প্রয়োজনীয় প্রমাণ মেলেনি বলে পুলিশের বক্তব্য। দুর্নীতি দমন আইন প্রয়োগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান থাকতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এই আইনি পদক্ষেপ এখনও আদালতের অনুমোদন ও মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।
এখন প্রশ্ন, এই গোটা আর্থিক লেনদেনের জাল কতদূর বিস্তৃত? MassArt-এর সঙ্গে কোন কোন সংস্থার কী সম্পর্ক? ইন্দ্রনীলের (Indranil Sen) স্ত্রী ও মেয়ের কাছে কি মিলবে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র? এখনও পর্যন্ত স্ত্রী-সহ মোট ন’জনকে জেরা করেছে গোয়েন্দারা বলে জানা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে UNESCO-র নাম ও লোগো ব্যবহার। অভিযোগ, ২০২২ সালে তৈরি MassArt নিজেদের UNESCO-র সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার করেছিল। অথচ UNESCO-র বক্তব্য, ওই সংস্থার সঙ্গে তাদের কোনও চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। এই অভিযোগের সত্যতা, আর্থিক লেনদেনের হিসেব এবং কার কী ভূমিকা, সবই এখন তদন্তের আওতায়।
একদিকে পুলিশের জেরা, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের নাম ঘিরে আর্থিক লেনদেনের প্রশ্ন, তার মাঝেই পুলিশের সামনে স্বামী-স্ত্রীর কথাকাটাকাটির চাঞ্চল্যকর দাবি! পুজোর পাস বিক্রির অভিযোগের তদন্ত এখন আর শুধু ইন্দ্রনীল সেনকে (Indranil Sen) ঘিরে আটকে নেই। তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপে কী নতুন তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই নজর। তবে মনে রাখতে হবে, পুলিশি অভিযোগ বা তদন্তে উঠে আসা তথ্যই এখনও পর্যন্ত সবকিছু—আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।


