Aaj India Desk,কলকাতা: রাজ্যের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প এবং শিশুদের টিকাকরণ এই দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়কে এক সুতোয় বেঁধে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন বিজেপি নেত্রী তথা মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul)। তাঁর বক্তব্য, যারা নিজেদের সন্তানকে ভ্যাকসিন দিতে চান না, তারা সরকারকে বিশ্বাস করেন না। আর যারা সরকারকে বিশ্বাস করেন না, তাদের সরকারের টাকা নেওয়ারও গুরুত্ব নেই।
মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া সব জায়গাতেই শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা, সমালোচনা ও কটাক্ষ। প্রশ্ন উঠছে, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে টিকাকরণের সম্পর্ক কোথায়? স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সরকারি আর্থিক সহায়তা দুইয়ের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা।
তাহলে কি সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষদের লক্ষ্য করেই এই ধরনের নৈতিকতার পাঠ দেওয়া হচ্ছে? কারণ বাস্তব সম্পূর্ণ অন্য কথা বলছে , সরকারি ব্যবস্থার উপর পূর্ণ আস্থা থাকলে মন্ত্রীদের সন্তানরা বিদেশে পড়তে যায় কেন? সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বড় অংশই বা নিজেদের সন্তানকে সরকারি স্কুলে না পাঠিয়ে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করান কেন?
তাহলে কি ধরে নেওয়া হবে, তাঁরাও সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করেন না? যদি সেই যুক্তি মানা হয়, তবে কি তাঁদের সরকারি বেতন নেওয়াও প্রশ্নের মুখে পড়বে? নাকি এই ধরনের কঠোর যুক্তি শুধুমাত্র অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের উপর নির্ভরশীল নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্যই প্রযোজ্য?
২০১৫ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল, সরকারি স্কুলের মান বাড়াতে সরকারি কর্মচারী, আমলা ও শিক্ষকদের সন্তানদের সরকারি স্কুলেই পড়ানো উচিত। আদালতের যুক্তি ছিল, যাঁরা ব্যবস্থার দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের পরিবারই যদি সেই ব্যবস্থার উপর ভরসা না করে, তাহলে উন্নতি কীভাবে হবে?
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। হুগলি, বীরভূম-সহ একাধিক জেলার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, বহু সরকারি শিক্ষকের সন্তান বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। কোথাও ৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে ৮-১০ জনের বেশি শিক্ষকের সন্তানও সরকারি স্কুলে নেই।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে সাধারণ মানুষ সরকারি ব্যবস্থার বাইরে কিছু বেছে নিলে তাঁরা সরকারকে বিশ্বাস করেন না, আর ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে সেটাই ব্যক্তিগত পছন্দ কেন? আস্থা বক্তৃতায় নয়, বাস্তব উন্নয়নেই তৈরি হয়।
অনেকেই বলছে , এই মন্তব্যে এক ধরনের শ্রেণিগত ঔদ্ধত্য স্পষ্ট। যেখানে সমাজের একাংশকে সহজেই সরকারবিরোধী তকমায় দাগিয়ে দেওয়া যায় ,অথচ ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। আবার অনেকেই বলছে,এটি শুধুই একটি মন্তব্য নয়, বরং সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নাগরিক কাদের বলা হবে, সেই মানসিকতারও বহিঃপ্রকাশও।
যদিও অনেকেই বিজেপি নেত্রীর বক্তব্যকে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, তবুও এটি আসলে দরিদ্র মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি করার এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা। কারণ দেশে টিকা নেওয়া বা না নেওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে আইন তো তাই বলছে, কিন্তু খাদ্য সহায়তা বা আর্থিক অনুদান কোনও সরকারের দয়া নয় তা নাগরিকের করের টাকাতেই পরিচালিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বলেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ।


