Aaj India Desk,কলকাতা: প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার সকালে নিউটাউনের ইকোপার্কে শরীরচর্চা ও প্রাতঃভ্রমণে যান রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সেবাশ্রয় বিতর্ক, কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস, পুর ও পঞ্চায়েতের আর্থিক অনিয়ম, সুরুচি সংঘের দুর্গাপুজো এবং দক্ষিণ দমদম পুরসভার নিয়োগ দুর্নীতিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের মতামত জানান তিনি।
সেবাশ্রয় বিতর্কে এফআইআর, অভিষেককে ঘিরে বাড়ছে চাপ?
সেবাশ্রয় প্রকল্পকে ঘিরে দায়ের হওয়া এফআইআর এবং রাজনৈতিক চাপের প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, “কেউ কাউকে কোনঠাসা করছে না। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের স্বাস্থ্য ও সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, তাঁদের শাস্তি হওয়া উচিত।”
তিনি অভিযোগ করেন, চিকিৎসা পরিষেবার নামে অনিয়ম হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ওই প্রেসক্রিপশন দেখে ডাক্তারের লেখা বলে মনে হচ্ছে না। তাহলে কে লিখেছে? তার ফলেই একজন মানুষের পা পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
“এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র”
দিলীপ ঘোষের দাবি, সামনে আসা ঘটনাটি একমাত্র ঘটনা নয়। তাঁর মতে, সরকারের পরিবর্তনের পর মানুষ ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, “এখন মানুষ সাহস পাচ্ছেন অভিযোগ জানাতে। যা সামনে এসেছে, তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। দুর্নীতি, হিংসা এবং ভয় দেখানোর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। এখন মানুষ ন্যায়বিচার চাইছেন। প্রশাসন সেই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখবে।”
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে ২০০ করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে দিলীপ ঘোষ বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটারের সংখ্যা ও বুথের সংখ্যায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, “কোথাও একটি ওয়ার্ডে ৭০-এর বেশি বুথ, আবার কোথাও মাত্র ১০-১২টি বুথ। অথচ দু’জন কাউন্সিলরের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সমান। এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন।”
একইসঙ্গে তিনি জানান, প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নতুন পুরসভা, ব্লক এবং পঞ্চায়েত গঠন নিয়েও সরকার ভাবছে। তাঁর দাবি, “মানুষ যাতে দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে পরিষেবা পান, সেই লক্ষ্যেই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।”
“টাকা ছিল, পরিকল্পনা ছিল না”
পুরসভা ও পঞ্চায়েতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের টাকা খরচ না হওয়ার প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “হাজার হাজার কোটি টাকা পড়ে রয়েছে, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেই টাকা কাজে লাগানো যায়নি। উন্নয়নের বদলে কাটমানির রাজনীতি হয়েছে। পরিষেবা দেওয়ার জন্য নয়, টাকা রোজগারের জন্য অনেকেই রাজনীতিতে এসেছিলেন।”
তাঁর অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সুরুচি সংঘে পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য
সুরুচি সংঘের দুর্গাপুজোর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাসের অনুপস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন দিলীপ ঘোষ।
তিনি বলেন, “পরিবর্তনের শুরু হয়েছে। ক্লাব, ক্রীড়া সংস্থা, সামাজিক সংগঠন— সব জায়গায় রাজনৈতিক দখলদারি চলেছে। এগুলো যারা চালান, তাঁদের হাতেই দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”
তাঁর মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমলে সংগঠনগুলির স্বাভাবিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।
দক্ষিণ দমদম পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতিতে নতুন অভিযোগ
দক্ষিণ দমদম পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, বহু পুরসভায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু পরিষেবার মান তেমন বাড়েনি।
তিনি দাবি করেন, “অনেক জায়গায় শত শত কর্মী রয়েছেন, কিন্তু খুব কম সংখ্যক মানুষ বাস্তবে কাজ করেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ তার খেসারত দিচ্ছেন।”
সাইবার প্রতারণার টাকা উদ্ধারে প্রশাসনের সাফল্য
বিধাননগর সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনাকে স্বাগত জানিয়ে দিলীপ ঘোষ বলেন, এখনও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ আর্থিক লেনদেন চলছে।
তাঁর বক্তব্য, “অনেক বেআইনি টাকা এখনও বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলি ধীরে ধীরে সেগুলি উদ্ধার করছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”


