OPINION PIECE
বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ! ভারতের এই গৌরব আজ হয়ত শুধুই কাগজ আর ভাষণে! ‘প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে’ এমনিতেই ২০২৬ এ যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে ১৮০ টি দেশের মধ্যে ১৫৭ নম্বরে স্থান পেয়েছে ভারত! ধীরে ধীরে প্রতিবাদের মুখও বন্ধ হচ্ছে দেশজুড়ে। সরকার বিরোধী কথা বললেন, বা প্রশ্ন করলেই তকমা জোটে ‘দেশবিরোধী’!
এবার তো কার্যত ‘তালিবানি শাসন’-এর ছবি ধরা পড়ল অসমে! গুয়াহাটির খানাপাড়ার জ্যোতি-বিষ্ণু অডিটোরিয়ামের কাছে ‘সরকারি সম্পত্তির দেওয়ালে’ সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের (Sonam Wangchuk) মুরাল আঁকার অভিযোগে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ধৃতদের পরিচয় নকুল মিলি (ডিব্রুগড়) এবং গৌরব সিংহ (গুয়াহাটি) বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, গভীর রাতে টহলদারি চলাকালীন ওই দুই যুবককে দেওয়ালে ছবি আঁকার সময় হাতেনাতে ধরা হয়। ‘সরকারি সম্পত্তি নষ্ট’ করার অভিযোগে দিসপুর ও বশিষ্ঠ থানায় পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে। ডিসিপি (ইন্টেলিজেন্স) হিরণ্য বর্মন জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা স্বীকার করেছেন যে তাঁরা সোনম ওয়াংচুকের (Sonam Wangchuk) মুরাল আঁকছিলেন। ‘সরকারি সম্পত্তি নষ্টের’ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের করের টাকায় তৈরি পিলারে দেশের একজন অন্যতম স্বনামধন্য বিজ্ঞানী-পরিবেশবিদ-শিক্ষাবিদের মুরাল আঁকা এই সোনার ভারতে বর্তমানে ‘অপরাধের’ তালিকায়! কোনও রাজনৈতিক পোস্টার নয়, কোনও উসকানিমূলক স্লোগানও নয়। তবুও সেই ছবি আঁকার অভিযোগে দুই যুবক পুলিশের হাতে আটক। আর এই ঘটনাই ফের সামনে এনে দিল একটি বড় বিতর্ক, ভারতে মতপ্রকাশের পরিসর কি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, নাকি এটি শুধুই সরকারি সম্পত্তি রক্ষার আইনি পদক্ষেপ?
আসলে বিতর্ক অন্য জায়গায়। যে ব্যক্তির ছবি আঁকা হচ্ছিল, তিনি বর্তমানে জাতীয় স্তরে আলোচিত আন্দোলনের মুখ। সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk) দীর্ঘ ২০ দিনের অনশন শেষে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর আন্দোলনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। ফলে সমর্থকদের দাবি, এটি শুধুমাত্র দেওয়াল নষ্টের মামলা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী শিল্পকর্মকে থামানোর ঘটনাও বটে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। আইন প্রয়োগ কি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে হচ্ছে? বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংগঠন কিংবা স্থানীয় গোষ্ঠীর পোস্টার, ব্যানার, দেওয়াল লিখন বা চিত্রাঙ্কনের বিরুদ্ধে কি একই ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ দেখা যায়? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সবশেষে বলা যায়, ওয়াংচুকের (Sonam Wangchuk) মুরাল আঁকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া দুই যুবকের ঘটনা তাই কেবল একটি ফৌজদারি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আইন প্রয়োগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতীক এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা, এই চারটি প্রশ্নকে একই ফ্রেমে এনে ফেলেছে। শেষ পর্যন্ত আদালত ও তদন্তই নির্ধারণ করবে অভিযুক্তদের আইনি দায় কতটা। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক যে এত সহজে থামবে না, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
(দেবী)


