Aaj India Desk, পূর্ব বর্ধমান: কে কোথায় জমি কিনেছেন, কার নামে কত বাড়ি, কোন ব্যবসায় কতটা বিনিয়োগ, গত কয়েক বছরে সম্পত্তির পরিমাণ কীভাবে বেড়েছে—এমন নানা তথ্যই নাকি এখন খোঁজ করা হচ্ছে পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকায়। অভিযোগ, এই কাজ কোনও দুর্নীতির তথ্য সামনে আনা বা প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। বরং সম্পত্তির হিসেব জেনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের জন্যই একটি মহল সক্রিয়। আর এই অভিযোগের তির বিজেপির (BJP) একাংশের দিকে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রথমে টার্গেট করা হচ্ছে তৃণমূলের (TMC) নেতা-কর্মী, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যবসায়ীদের। তাঁদের সম্পত্তি, জমি-বাড়ি, ব্যবসা এবং আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সেই তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে বিজেপির কয়েকজন নেতার কাছে। এরপরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন করে তাঁদের সম্পত্তির খুঁটিনাটি জানিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত সামনে রাখা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকার দাবি।
অভিযোগ আরও গুরুতর জায়গায় পৌঁছেছে—সম্পত্তির পরিমাণ যত বেশি, টাকার দাবিও নাকি তত বেশি। এমনকি তৃণমূলের আমলে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কত টাকা তোলার অভিযোগ ছিল, সেটিও নাকি নতুন করে টাকা চাওয়ার ক্ষেত্রে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের পরও কেন একই ধরনের অভিযোগ উঠছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে স্থানীয় মহলে। অনেকের বক্তব্য, তৃণমূল আমলে তোলাবাজি নিয়ে একাধিক অভিযোগ শোনা গিয়েছিল। কিন্তু এখন ফোন করে সরাসরি বিপুল অঙ্কের টাকা চাওয়ার মতো অভিযোগও সামনে আসছে।
কিছুদিন আগেই পূর্ব বর্ধমানের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছিলেন, এক বিজেপি নেতা তাঁর কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছেন। বিষয়টি তিনি পুলিশকে জানিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও করেন। যদিও ওই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বিজেপির জেলা সংগঠনের মধ্যেও। দলের পুরনো কর্মীদের একাংশ প্রকাশ্যেই তোলাবাজি ও রাজনৈতিক জরিমানার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদলের পর বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, এই সংঘাতের পিছনে রয়েছে এলাকার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই। কোথাও ব্যবসায়ী ও সম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ, কোথাও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর জরিমানা চাপানোর অভিযোগ, আবার কোথাও জমি ও কৃষিকাজের উপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে। ফলে এলাকার ‘আর্থিক নিয়ন্ত্রণ’ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে বিজেপির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপড়েন বাড়ছে বলে অভিযোগ।
এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ছবিও ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি মন্তেশ্বরে বিজেপি বিধায়ক সৈকত পাঁজাকে ঘিরে দলেরই একাংশ বিক্ষোভ দেখিয়ে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। বর্ধমানের শ্যামলাল এলাকায় বিজেপির দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে এক মহিলা নেত্রী-সহ কয়েকজন আহত হন। জামালপুর ও কালনাতেও একাধিকবার দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে।
দলের পুরনো কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার কয়েক বছর পর বিভিন্ন এলাকায় অর্থনৈতিক কর্তৃত্বকে কেন্দ্র করে যে ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিজেপির অন্দরেও তার ছায়া দেখা যাচ্ছে। তৃণমূল নেতা দেবু টুডুর অভিযোগ, “আমাদের বহু কর্মী এখনও ঘরছাড়া। অনেকের জমিতে চাষ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের কাছ থেকে জরিমানা চাওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে না পারলে চাষ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অসহায় মানুষ কার কাছে যাবেন, বুঝতে পারছেন না।”
অভিযোগের বিষয়ে বিজেপি নেতা তথা গলসির বিধায়ক রাজু পাত্র অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত কাউকেই দল প্রশ্রয় দেবে না। তাঁর কথায়, “দলের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, কেউ অন্যায় কাজে যুক্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাঁরা এখনও তোলাবাজি করছেন বা জরিমানা আদায় করছেন, তাঁরা নিজেদের সংশোধন না করলে সমস্যায় পড়বেন। শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার সতর্ক করেছে।”
বিজেপি সূত্রের দাবি, তোলাবাজির অভিযোগে কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে সাময়িকভাবে দল থেকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। নতুন করে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে। জেলা বিজেপির এক নেতার দাবি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু দলীয় শাস্তি দিয়েই বিষয়টি থামানো হবে না। প্রয়োজন হলে অভিযুক্তদের বহিষ্কারের পাশাপাশি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়ে আইনি পদক্ষেপের পথেও হাঁটবে দল।
তবে সম্পত্তির তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক কোন্দল বা দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়েও যেতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই অভিযোগগুলির বিষয়ে প্রশাসন আদৌ তদন্তে নামে কি না, আর বিজেপি নেতৃত্ব যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।


