SPECIAL FEATURE
বাঙালিরা একসময় ভোট (Vote) দিতেন আদর্শে। বছরের পর বছর ধরে সেই সংস্কৃতি বজায় ছিল পশ্চিমবঙ্গে। তবে এখন সেই চিত্র বদলেছে। এখন মানুষ মাছ না মাংস, ভাতা না ডাবল ভাতা – এই কঠিন দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ভোট দেন !
২০২৬-এর বাংলার ভোটে (Vote) উন্নয়ন যেন সেই আত্মীয়, যাকে নিমন্ত্রণ করা হলেও কেউ ঠিক খোঁজ নেয় না। সভামঞ্চে উন্নয়নের কথা ঢাক ঢোল বাজিয়ে বলা হলেও, কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে “ওরা এলে মাছ মাংস খেতে দেবে তো?” বা “এরা ভাতা ৫০০ বাড়াবে তো?” এই প্রশ্নগুলোই ঘোরা ফেরা করে।
উন্নয়ন থেকে ভাতার রাজনীতি: কীভাবে বদলাল বাংলা?
২০০৬-এ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ছিল শিল্প বনাম জমির লড়াই। তারপর ধীরে ধীরে বাংলার ভোটের ইস্যু সরে এসেছে। প্রথমে দুর্নীতি, তারপর কর্মসংস্থান, আর এখন সরাসরি ‘ওয়েলফেয়ার বনাম ওয়েলফেয়ার’। আজ পরিস্থিতি এমন যে, সরকার নিজেই গর্ব করে বলছে, ৯৪টি থেকে বেড়ে ১০০-র কাছাকাছি সামাজিক প্রকল্প চালু হয়েছে।
অর্থাৎ, উন্নয়নের জায়গা নিয়ে নিয়েছে ‘ডেলিভারি’। রাস্তা বানানো বা চাকরি দেওয়া নয়, সরাসরি অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোই এখন রাজনীতির প্রধান অস্ত্র।
ভোটের নতুন অর্থনীতি
আজ রাজনীতির দাবার বোর্ডে নেতাদের হাতের বোরে মহিলা এবং যুব ভোটার। প্রায় অর্ধেক ভোটারই মহিলা এবং যুব প্রজন্ম এবং তাঁদের অংশগ্রহণ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলছে। ফলে ভাতা ও প্রকল্পের আড়ালে তাদের মন জয়ের চেষ্টায় সদা সক্রিয় নেতারা। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলার ৮৫% এর বেশি মহিলা এই সমস্ত সরকারি ভাতায় নিজেকে “ক্ষমতায়িত” মনে করেন। গ্রামে ভাতা পেলে রাস্তার গর্ত নিয়ে কম অভিযোগ ওঠে, শহরে মাসিক টাকা পেলে চাকরির দাবি চাপা পড়ে।
রাজনীতিবিদরা এটা অনেক আগেই বুঝে গেছেন। তাই ‘ফ্রিবি বনাম উন্নয়ন’ বিতর্কটা আসলে ধাপ্পা। দু’পক্ষই ভাতা বাড়িয়ে ভোট (Vote) কিনছে। কেউ বলছে “মর্যাদা”, কেউ “সম্মান”, কিন্তু আসল ইস্যু মাসিক ক্রেডিট। ‘মাছ না মাংস’ বিতর্ক সাংস্কৃতিক আইডেন্টিটির আড়ালে ভোটের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
বাংলার আসল অবস্থা কেমন ?
বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা একসময় দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে পরিচিত ছিল। আজ সেই ব্যবস্থা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। TET ও SSC নিয়োগ দুর্নীতির কারণে সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালে ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক-কর্মীর নিয়োগ বাতিল করে। ফলে হাজার হাজার স্কুলে শিক্ষকের অভাব তীব্র হয়েছে। ২০২৫ সালে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাডমিশনের আবেদন আগের বছরের ৫.৩ লক্ষ থেকে নেমে ৩.৫৯ লক্ষে ঠেকেছে। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের পাইপলাইন ভেঙে পড়ায় ছাত্রছাত্রীরা রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র পালাচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড়ে বেড পাওয়া দুষ্কর, ওষুধের অভাব, মেয়াদোত্তীর্ণ স্যালাইন বা সরঞ্জামের কারণে মা-শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কলকাতার এসএসকেএম, আরজি করের মতো বড় হাসপাতালেও লিফটম্যানের অভাবে আত্মীয়রা নিজেরাই লিফট চালান, ওয়ার্ডগুলো অপরিষ্কার ও অপর্যাপ্ত স্টাফে ভরা। কেন্দ্রীয় আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প বাংলা গ্রহণ না করায় রাজ্যের রোগীরা দেশের অন্যান্য হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে ধনীরা প্রাইভেট বা দক্ষিণ ভারতে ছুটছেন, গরিবরা অসহায়ভাবে সরকারি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (পিএলএফএস) অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৫-এ রাজ্যের বেকারত্বের হার ৩.৬ শতাংশ, জাতীয় গড় ৪.৮ শতাংশের নীচে। গ্রামে ৩.১, শহরে ৪.৬। কিন্তু যুবকদের (১৫-৪০) মধ্যে ছবিটা আলাদা। তাই নতুন স্কিম ‘যুবসাথী’ চালু করতে হল।সংসদীয় তথ্য অনুসারে, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬,৬৮৮টি কোম্পানি রাজ্য ছেড়ে চলে গেছে। বাংলা থেকে মহারাষ্ট্র, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে বহু মানুষ। বাংলায় শিল্প নেই, স্টার্টআপ নেই, বিনিয়োগ নেই।
বাংলা যে একদিন শিল্প-বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিত, সেই বাংলা আজ ‘ভাতা বনাম মাছ-মাংস’-এর লড়াইয়ে নেমেছে। বাংলা ভবিষ্যতের জন্য ভোট দিচ্ছে, না কি মাসের শেষে ব্যাংক ব্যালেন্সের জন্য সেটা এখন বোঝা দুষ্কর।
বাংলা কি সত্যিই এটাই চায়? এটাই এখনকার ‘মর্যাদা’র নতুন সংজ্ঞা? সেটাই আজ ভোটের বাজারে সবথেকে বড় প্রশ্নচিহ্ন। ভোটার যদি এখনও প্রশ্ন না করে তাহলে বাঙালির ভবিষ্যৎ শুধু ব্যাঙ্কের এসএমএস-এ সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। রাজনীতির খেলায় এখন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর শুধু ভাতার অঙ্ক বাড়বে, আর উন্নয়নের স্বপ্নটা পুরনো খবর হয়ে থেকে যাবে।


