Aaj India Desk , কলকাতা: আগামী ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচন। ভোট যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দান হয়ে উঠছে আরও রঙিন, আরও বিতর্কিত এবং অনেকের মতে আরও অদ্ভুত। প্রচারের নতুন অস্ত্র হিসেবে এবার সামনে এসেছে সাপ-লুডো। শিশুদের খেলার এই সাধারণ বোর্ড গেমকেই ভোটের প্রচারের কেন্দ্রে এনে কার্যত রাজনৈতিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিল তৃণমূল কংগ্রেস। আর এই উদ্যোগ ঘিরেই এখন শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক কটাক্ষ।
তৃণমূলের তরফে ভোটারদের মধ্যে যে প্রচার কার্ড বিলি করা হচ্ছে, তাতে একদিকে লেখা রয়েছে ‘দিদির ১০ প্রতিজ্ঞা’। সেই কার্ড খুললেই দেখা যাচ্ছে সাপ-লুডোর ছক। সেখানে সিঁড়ি হিসেবে দেখানো হয়েছে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও পদক্ষেপকে। যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবশ্রী, কন্যাশ্রী, বাংলার বাড়ি এইসব প্রকল্পকে ব্যবহার করা হয়েছে ‘উন্নয়নের মই’ হিসেবে, যা ভোটারদের উপরের ঘরে অর্থাৎ ১০০ নম্বরে পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে লেখা রয়েছে ‘জয় বাংলা’।
তৃণমূলের দাবি, এই চিত্রায়ণ আসলে উন্নয়ন এবং সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের জীবনে পরিবর্তনের প্রতীক। কিন্তু বিরোধীদের মতে, এটি সরাসরি সরকারি প্রকল্পকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বানানোর এক সুপরিকল্পিত কৌশল। তাদের অভিযোগ, জনগণের টাকায় চলা প্রকল্পকে ভোটের লোভ দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আদর্শ আচরণবিধির সীমা কতটা মানছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আরও বিতর্ক বাড়িয়েছে সাপের মুখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র। সেখানে বিজেপি নেতাদের মুখের আদলে তৈরি কার্টুন ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে লেখা রয়েছে ‘মাতৃভাষায় কথা বন্ধ’, ‘মাছ-মাংস বন্ধ’, এমনকি ‘ভোটাধিকার বাতিল’-এর মতো তীব্র রাজনৈতিক বার্তা। বিরোধীদের দাবি, এটি শুধুই ব্যঙ্গ নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার চেষ্টা। বিজেপি শিবিরের মতে, উন্নয়নের আলোচনা থেকে সরে এসে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কার্টুন রাজনীতিকে সামনে আনা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, এই ধরনের প্রচার আসলে রাজনীতিকে একটি গেমিফাইড , যেখানে বাস্তব সমস্যার আলোচনা কমে গিয়ে প্রতীকী প্রচার ও দৃশ্যমান নাটকীয়তা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ কেউ একে বোর্ড গেম পলিটিক্স বলেও কটাক্ষ করছেন।
এই প্রচার শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কলকাতার একাধিক ওয়ার্ডে তৃণমূল কাউন্সিলররা এই সাপ-লুডো বোর্ড নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। মহিলা ভোটারদের মধ্যে বিলি করা হয়েছে এই কার্ড, কোথাও আবার আবাসন কমপ্লেক্সে গিয়ে সরাসরি প্রচার চালানো হয়েছে। বেলেঘাটা এলাকায় প্রার্থী কুণাল ঘোষকেও এই বোর্ড হাতে প্রচার করতে দেখা যায়। ফলে প্রচার যেন একদিকে যেমন প্রযুক্তিনির্ভর, অন্যদিকে তেমনই প্রতীকনির্ভর হয়ে উঠছে।
তবে এই পুরো উদ্যোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিদ্রুপ শুরু হয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য, যদি উন্নয়নই প্রধান বিষয় হয়, তবে সেটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য শিশুদের বোর্ড গেমের আশ্রয় কেন নিতে হবে? উন্নয়ন কি এতটাই জটিল যে তাকে বোঝাতে সাপ-লুডো দরকার?
অন্যদিকে, তৃণমূল শিবিরের যুক্তি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে সংযোগ স্থাপন করতেই এই ধরনের সৃজনশীল প্রচার। তাদের দাবি, রাজনীতিকে শুধু বক্তৃতা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের দৈনন্দিন সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করাই তাদের লক্ষ্য।
কিন্তু বাস্তবে ছবিটা দাঁড়াচ্ছে অন্যভাবে। একদিকে উন্নয়নের সিঁড়ি, অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গের সাপ এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত কে উঠবে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে, আর কাকে সাপের মুখে নামতে হবে তার সিদ্ধান্তই দেবে ভোটবাক্স।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রচার হয়তো ভোটের আবহ তৈরি করছে, কিন্তু একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক আলোচনার গভীরতাকে হালকা করে দিচ্ছে। কারণ যখন রাজনীতি বোর্ড গেমে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে এটা কি সত্যিই জনগণের ইস্যু, নাকি শুধুই রাজনৈতিক বিনোদন?
নির্বাচনের দিন যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এবারের লড়াই শুধু ভোটের নয়, বরং প্রতীক, ব্যঙ্গ আর প্রচারের এক নতুন ভাষার লড়াই। আর সেই ভাষায় সাপ-লুডো এখন রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত খেলা।


