SPECIAL FEATURE
স্নেহা পাল : উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা লক্ষণ সরোজ ১৯৭৭ সালে এক খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর কোর্টের রায় জানায় “Not Guilty”। কিন্তু শাস্তি তো তিনি ইতিমধ্যেই ভোগ করেছেন, বছরের পর বছর কারাবাস, অনিশ্চয়তা এবং জীবনের অপচয়। এটি কেবল একজনের গল্প নয়। এটি ভারতের ভেঙে পড়া বিচারব্যবস্থার (Justice System) এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
মামলার পাহাড়ে চাপা আদালত
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে ৮৮,০০০-এর বেশি মামলা ঝুলে রয়েছে। হাইকোর্টগুলিতে এই সংখ্যা ৬০ লক্ষেরও বেশি, আর জেলা ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৪.২ কোটির বেশি মামলা বিচারাধীন। ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৫ কোটির কাছাকাছি। প্রতি বছর প্রায় আরো ৫ কোটি নতুন মামলা দায়ের হয়। কিন্তু নিষ্পত্তি হয় গড়ে মাত্র ২ কোটির মতো। ফলে প্রতি বছরই মামলার সংখ্যা বাড়ছে। বিচারব্যবস্থার উপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকায় মামলার নিষ্পত্তির সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে।
বিচারকের অভাবে জট
ভারতের মোট বিচারকের সংখ্যা প্রায় ২১,০০০। জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতি ১০ লক্ষে মাত্র ১০ জন বিচারক। অথচ ১৯৮৭ সালের আইন কমিশন অনুযায়ী, এই অনুপাত হওয়া উচিত ৫০। উচ্চ আদালতগুলিতে বহু পদ খালি পড়ে থাকে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে দায় চাপানোর প্রবণতায় হারিয়ে যায় মানুষের বিচার পাওয়ার আশা।
দেশের সরকার এই জটের একটি বড় অংশ জুড়ে বিরাজমান। দেশে মোট মামলার প্রায় অর্ধেকেই সরকারি পক্ষ জড়িত। প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দপ্তরগুলির মধ্যেই মামলা হয়। সংসদে উপস্থাপিত লিগ্যাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ব্রিফিং সিস্টেম (LIMBS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই প্রায় ৬,৯৮,৯০৪টি মামলার পক্ষভুক্ত।
ন্যায়ের অপেক্ষায় ক্লান্ত সাধারণ মানুষ
ভারতের এই ভেঙে পড়া বিচারব্যবস্থার (Justice System) ফল ভুগছেন সাধারণ মানুষ। বিচারের আশায় দিনের পর দিন আদালতের চৌকাঠে পড়ে থাকা মানুষদের কপালে জোটে শুধু পরের শুনানির তারিখ। দিন শেষে বিচারব্যবস্থাও তাদের কাছে এক প্রহসন, যেখানে ন্যায়বিচার ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় মানসিক তো বটেই, আর্থিকভাবেও নিঃস্ব হয়ে যায় বহু পরিবার।
“Justice delayed is justice denied” প্রবাদকে সত্য প্রমাণ করেই এগোচ্ছে ভারতের বিচারব্যবস্থা (Justice System)। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না মেলার এই বাস্তবতা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা। দ্রুত সংস্কার, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন না আনা হলে আগামী দশকেও বিচার ব্যবস্থার এই একই চিত্র বহাল থাকবে। আর ততদিন পর্যন্ত, ন্যায়বিচার কাগজে বা সিনেমার পর্দায় দেখানো হলেও বাস্তবে তা অধরাই থাকবে।


