বিগত এক দশকে প্রায় ৯৪ হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে এই ৮০ বছরের ‘স্বাধীন’ ভারতবর্ষে (Independence Day)। এরই মধ্যে খানা পঞ্চাশেক ‘ভবিষ্যত’ নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এই দেশেরই কোনও এক মফস্বলের বিইএসএনজিজিএসএফপি বিদ্যালয় (Govt Primary School)। আমার দাদা যেখানে একজন শিক্ষক, এই ৫০ খানা চারাগাছকে আগামীর ঝড়-জল-দাবদাহ সহ্য করার মতো মহীরুহে পরিণত করার লড়াই করছে। এবছর ১৫ আগস্ট সেই স্কুলের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হল আমার।

নীল প্যান্ট-সাদা জামায় খুদেরা তখন স্কুলের বারান্দায় জাতীয় গান এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সকলেই দিন আনি দিন খাই, খেটে খাওয়া ঘরের সন্তান, অধিকাংশই সংখ্যালঘু পরিবারের। কারও একটু বড় করে বানানো স্কার্ট, যাতে প্রাইমারীর (Govt Primary School) গন্ডিতা এক জামাতেই পেরেনো যায়। কেউ আবার পড়ছে দাদার হাফ প্যান্ট-শার্ট, একজনের জামার হাতার কাছটায় ছিঁড়ে গেছে! কিন্তু, স্বাধীনতা দিবস (Independence Day) বলে কথা! যার কাছে যেটুকু আছে, তাকেই সাধ্যমত কেচে ধুয়ে পরে আসার চেষ্টা করেছে। মাস্টারমশাই পতাকা উত্তোলনের পর শৃঙ্খলাবদ্ধ সারিতে দাঁড়িয়ে আগে ‘বন্দে মাতরম’ তারপর জাতীয় সংগীত গাইলো সবাই। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে এই পর্ব শেষ হতেই কয়েকজন পড়ুয়ার মা, ওরনা-আবায়ায় মাথা ঢেকে তেরঙ্গার সামনে প্রণাম করে গেলো আবার!

আমিও গুটিগুটি পায়ে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করলাম। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলো রংতুলি দিয়ে স্বপ্ন এঁকেছে চার দেওয়ালে। কোথাও মাটির ঘরের মাথায় খোলা নীল আকাশে রামধনু, কোথাও খাঁচার পাখি উড়ে যাচ্ছে, তো কোথাও এক বৃন্তে গোলাপী দুই কুসুম। এছাড়াও গাছপালা, বাড়িঘর অরও কত কি! যেন শিশুগুলোর মনের রং আছড়ে পড়েছে দেওয়াল গুলোয়! কচি হাতে কতজন বানিয়েছে নানারকম হাতের কাজ!

একটা বড় ঘরে সবাই এসে বসলো। এখানেই হবে এই খুদেদের ‘স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান’। কি মজা! আজ পড়া নেই, স্যারের বকুনি নেই! আজ আনন্দের দিন ‘স্বাধীনতা দিবস’ (Independence Day)! নাচ হল, গান-আবৃত্তি হল, হল নাটকও! আমার গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও গাইলো ‘অ্যয় বতন মেরে বতন আবাদ রহে তু’…. সত্যিই তো, এই দেশটাকে আমাদের ‘আবাদ’ তো রাখতেই হবে এই মুখগুলোর জন্য! কত সারল্যে ভরা! যাদের মনে বেসরকারী স্কুলগুলোর মতো তাদের দেওয়া অর্থে মাস্টারমশাইয়ের সংসার চলে, এই অহং নেই! মাস্টারমশাই মানে সত্যিই তাদের কাছে গুরু! শ্রদ্ধা-আবদার-ভালোবাসার জায়গা! বাবা-মায়ের পর আক্ষরিক অর্থেই এরা শিক্ষককে রাখে।

যারা একটা নতুন পেনসিল বক্স পেলে পাশের বন্ধুটার কাছে আত্মম্ভরিতা দেখায় না! ‘ইউনিফর্ম’ শব্দটার অর্থ যেখানে সত্যিই ‘ইউনিফরমিটি’ বজায় রাখাই! যেখানে সবাই সমান! এক সারিতে বসে একদিন সবাই আলু সোয়াবিন দিয়ে ভাত খায় তো কোনোদিন খিচুড়ি! কার মা কত দামী টিফিন বক্সে পাস্তা দিল আর কার মা ওয়াফেল, এই আলোচনা হয় না! যাদের চোখে স্বপ্ন আছে, দিনমজুরের সন্তান থেকে শিক্ষক-ডাক্তার-অভিনেতা-ইঞ্জিনিয়র বা গায়ক হওয়ার। এই স্বাধীনতা দিবসে আমি এই নির্ভেজাল শৈশবকে উদযাপন করলাম! আর সবশেষে বলি, এই সরকারি স্কুলগুলোকে (Govt Primary School) বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব হয়তো ‘স্বাধীন ভারতের’ সকলের!
(লেখা: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)


