লখনউ: রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজনীতির রণকৌশল সময় অনুযায়ী না বদলালে, তাতে হিতের বিপরীত হয়। তবে উত্তরপ্রদেশে ভোট এলেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসেন ‘রাম’! কখনও রামমন্দির (Ram Mandir) উদ্বোধন, কখনও রামপথ, কখনও দীপোৎসব, আবার কখনও রামায়ণকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বার্তা। ফলে প্রশ্নটা এখন আর শাসক-বিরোধী ভোটকৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই! প্রশ্ন হল, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী রাজনীতি কি ক্রমশ ‘রাম-ভারোসে’ হয়ে যাচ্ছে?
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে অযোধ্যায় রামমন্দিরের (Ram Mandir) প্রাণপ্রতিষ্ঠা ছিল জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনা। বিজেপি সেই ঘটনাকে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল। বিরোধীরা অবশ্য অভিযোগ করেছিল, ধর্মীয় আবেগকে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে ভোটের ফল বলেছিল, অযোধ্যা-সহ উত্তরপ্রদেশের একাধিক আসনে বিজেপি প্রত্যাশিত ফল পায়নি। এমনকি খাস অযোধ্যার রামমন্দিরের (Ram Mandir) লোকসভা কেন্দ্র ফৈজাবাদে সমাজবাদী পার্টির কাছে হেরে যায় বিজেপি। সেই কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র আবেগ আর প্রতীকের উপর নির্ভর করলে ভোটের সমীকরণ সবসময় মেলে না।
কিন্তু রাজনীতি কি সেখানেই থেমে থাকে? উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই আবার আলোচনায় ‘রাম’। এবার মন্দির নয়, চর্চার কেন্দ্রে ‘রামায়ণ’ (Ramayana)। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রুপোলী পর্দায় সাংস্কৃতিক বয়ানকে আরও বিস্তৃত করে জনমানসে প্রভাব তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
নীতেশ তিওয়ারি পরিচালিত বহু প্রতীক্ষিত পৌরাণিক ছবি ‘রামায়ণ’ (Ramayana)-এর মুক্তির দিনক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন নির্মাতারা। প্রযোজক নমিত মালহোত্রা জানিয়েছেন, ছবির প্রথম পর্ব ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর, অর্থাৎ দীপাবলির দু’দিন আগে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। আবার একাধিক সূত্র বলছে, চলতি বছর নভেম্বর নাগাদই উত্তরপ্রদেশে ভোটপুজো অনুষ্ঠিত হবে। এই নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, ধর্মীয় আখ্যান, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক বার্তা, এই তিনকে একই সুতোয় গাঁথার কৌশল নতুন নয়, তবে উত্তরপ্রদেশে তা এখন আরও স্পষ্ট।
সমালোচকেরা অবশ্য কটাক্ষ করে বলছেন, “ভোট যত কাছে, রাম তত কাছে।” তাঁদের প্রশ্ন, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নিয়ে জন-আলোচনার পাশাপাশি কেন বারবার প্রতীকী ইস্যুই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে? অন্যদিকে বিজেপির যুক্তি একেবারেই আলাদা। দলের বক্তব্য, রাম কেবল ধর্মীয় প্রতীক নন, তিনি ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তাই রামমন্দির হোক বা চলচ্চিত্রে রামায়ণ (Ramayana), এগুলি রাজনৈতিক প্রকল্প নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর উদ্যোগ। অন্যদিকে বিজেপির যুক্তি একেবারেই আলাদা। দলের বক্তব্য, রাম কেবল ধর্মীয় প্রতীক নন, তিনি ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই রামমন্দির হোক বা রামায়ণ, এগুলি রাজনৈতিক প্রকল্প নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর উদ্যোগ।
এই বিতর্কের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের ভোট-রাজনীতি যেন এক নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান আর সাংস্কৃতিক প্রতীকের লড়াইয়ে কোনটি শেষ পর্যন্ত ভোটারের মনে বেশি জায়গা করে নেবে একসময় বলা হত, উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি নির্ভর করে জাতপাতের সমীকরণে। পরে যোগ হয়েছিল উন্নয়নের ভাষ্য। এখন সেই সমীকরণে আরও একটি স্থায়ী উপাদান যেন যোগ হয়েছে, ‘রাম’।
তাই কটাক্ষ করে অনেকে বলছেন, লোকসভার আগে রামমন্দির (Ram Mandir) , বিধানসভার আগে রামায়ণ, উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী ক্যালেন্ডার বুঝতে চাইলে, আগে বুঝুন ‘রাম-টাইমলাইন’। এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। তবে এটুকু মানতেই হবে, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘রাম’ এখন শুধু একটি ধর্মীয় নাম নন, তিনি এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক, যাকে ঘিরে আগামী ভোটেও উত্তাপ কমার কোনও লক্ষণ নেই।


