কলকাতা: স্বাধীনতা দিবসের রেশ কাটতে না কাটতেই বঙ্গ রাজনীতিতে নেমে এল শোকের ছায়া। রবিবার সকালে রামপুরহাটে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার হয়েছে দলের প্রবীণ নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ashish Banerjee) দেহ। ৭৫ বছরের নেতার মৃত্যু ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে তাঁর দেহের পাশ থেকে সুইসাইড নোট উদ্ধারের ঘটনায়। পুলিশ সেই নোটকে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখছে। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে সরাসরি দায়ী করেননি আশিসবাবু (Ashish Banerjee)। কিন্তু তাহলে কী এমন ঘটেছিল, যার জেরে এমন চরম সিদ্ধান্ত? সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ থেকে রাজনৈতিক মহল।
‘কেউ দায়ী নয়’, তবু প্রশ্ন একটাই—কেন?
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই বীরভূমের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। দলের প্রবীণ নেতা হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত ও ‘সজ্জন’ রাজনীতিকের। সেই নেতার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। সুইসাইড নোটে কাউকে দায়ী না করলেও তাঁর মৃত্যুর পিছনে কোনও মানসিক চাপ, অপমান কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। তবে এই মুহূর্তে কোনও সম্ভাবনাকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
‘১৫ বছরের ভুলের দায় নিতে হয়েছে নিরীহদের’—ঋতব্রতের বিস্ফোরক দাবি
খবর পেয়েই রামপুরহাটের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতা। যাওয়ার পথেই ভিডিও বার্তায় আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, গত ১৫ বছরে রাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা বিতর্ক ও আইনি সমস্যার দায় অনেক সময় দলের নিরীহ নেতাদেরও বহন করতে হয়েছে। তাঁদের এলাকায় অপমানিত হতে হয়েছে, কটূক্তি শুনতে হয়েছে ঋতব্রতের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির ভয়ংকর প্রভাব পড়েছিল আশিসবাবুর উপরও।
‘দলকে বারবার বলেছিলেন, যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না’
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ashish Banerjee) সঙ্গে নিজের কথোপকথনের কথাও তুলে ধরেছেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আশিসবাবুর আক্ষেপ ছিল। এমনকী, বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে কাজ করা কর্মীদের স্থায়ীকরণের বিষয়েও তিনি ঋতব্রতের কাছে অনুরোধ করেছিলেন বলে দাবি করেন ঋতব্রত।সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তাঁর আরেক দাবি, গত ১৫ বছরে বারবার দলকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন আশিসবাবু যে, ‘যা হচ্ছে, ঠিক হচ্ছে না’। কিন্তু তাঁর সেই বক্তব্য কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল? এই প্রশ্নও এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে।
পাল্টা তোপ অভিষেকের, কাঠগড়ায় ‘মিডিয়ার একাংশ’
অন্যদিকে, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে দীর্ঘ পোস্ট করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, আশিসবাবুকে এলাকায় হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছিল এবং তাঁর সুইসাইড নোটে ধারাবাহিক অপপ্রচার ও কালিমালিপ্ত করার যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে। অভিষেকের অভিযোগের নিশানায় সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং বিজেপি। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগকে ক্রমাগত প্রচার করে বড় করে তোলার রাজনীতির পরিণতি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। ফলে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর শুধু শোক নয়, তৃণমূলের অন্দরেই যেন শুরু হয়েছে দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার সংঘাত।
মৃত্যুর নেপথ্যে আসলে কী?
এখন তদন্তকারীদের সামনে একাধিক প্রশ্ন—
- সুইসাইড নোটে ঠিক কী বার্তা রেখে গিয়েছেন আশিস (Ashish Banerjee)?
- কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ কি তাঁকে প্রভাবিত করেছিল?
- ঋতব্রতের দাবি করা ‘অপমান’ ও ‘আক্ষেপ’-এর সঙ্গে মৃত্যুর কোনও যোগ রয়েছে?
- নাকি সুইসাইড নোটেই রয়েছে মৃত্যুর আসল কারণের ইঙ্গিত?
এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সময় আসেনি। পুলিশ নোটটি খতিয়ে দেখছে এবং গোটা ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ইতিমধ্যেই বঙ্গ রাজনীতিতে এক গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, এক প্রবীণ নেতার এমন করুণ পরিণতির পিছনে কি শুধুই ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক গল্প?


