কলকাতা: শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবিতে ক্ষমতায় এসেই কলেজগুলোর গভর্নিং বডি ভেঙে দিয়েছিল বিজেপি! তার পরিবর্তে প্রশাসক বসিয়ে চালানো হচ্ছিল সরকারি ও সরকার-পোষিত কলেজগুলি (College Governing Body)। কিন্তু এবার সেই ব্যবস্থাতেও বড় বদল। শনিবার শিক্ষাদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হল, কলেজের গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট পদে বসবেন বিধায়ক অথবা সাংসদ। প্রকাশ করা হয়েছে কলেজভিত্তিক প্রেসিডেন্টদের তালিকাও।
বাংলার শিক্ষাঙ্গণে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো। বাম আমলে ‘অনিলায়ন’-এর অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা বিষয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করত। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসানের পরও সেই বিতর্ক থামেনি। পরবর্তী সময়ে ‘তৃণমূলায়ন’-এর অভিযোগও ওঠে। কলেজে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে ছাত্র রাজনীতির প্রভাব নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি কলকাতার একটি কলেজে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে পরীক্ষা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রতিবাদ করে সমস্যায় পড়েছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শান্তা দত্ত। এমনকি স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের পরীক্ষায় তাঁকে না ডাকার অভিযোগও সামনে আসে।
এরপর ক্ষমতায় এসে শিক্ষাঙ্গণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর লক্ষ্যে বড় সিদ্ধান্ত নেয় বিজেপি সরকার। সরকার ও সরকার-পোষিত স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডি (College Governing Body) ভেঙে দেওয়া হয়। পরে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। সরকারের তরফে তখন বলা হয়েছিল, গভর্নিং বডিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব না থাকলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির প্রভাব থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু শনিবারের বিজ্ঞপ্তিতে সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন দেখা গেল।
শিক্ষাদপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, এবার সরকারি ও সরকার-পোষিত কলেজগুলির গভর্নিং বডির (College Governing Body) প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন বিধায়ক অথবা সাংসদ। প্রকাশিত তালিকায় থাকা জনপ্রতিনিধিরা সকলেই বিজেপির প্রতীকে নির্বাচিত।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক! আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, তালিকায় এমন জনপ্রতিনিধিদেরও দেখা যাচ্ছে, যাঁদের নিজস্ব বিধানসভা বা লোকসভা এলাকার বাইরে থাকা কলেজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষাঙ্গণকে রাজনীতিমুক্ত করার যে যুক্তিতে আগে GB (College Governing Body) ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, নতুন ব্যবস্থায় কি সেই লক্ষ্যই ফের প্রশ্নের মুখে পড়ছে?
সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি হতে পারে, জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে প্রশাসনিক সমন্বয় আরও সহজ হবে। কিন্তু বিরোধী মত বলছে, প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বসানো হলে কলেজের প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
ফলে বাংলার শিক্ষাঙ্গণে পুরনো বিতর্কই যেন নতুন মোড়ে ফিরে এসেছে, ‘অনিলায়ন’ থেকে ‘তৃণমূলায়ন’, আর এবার কি ‘বিজেপিকরণ’? শেষ পর্যন্ত নতুন গভর্নিং বডি (College Governing Body) ব্যবস্থা কলেজের প্রশাসনকে আরও কার্যকর করবে, নাকি শিক্ষাঙ্গণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে আরও জোরালো করবে, তার উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।


