Aaj India Desk, কলকাতা: রাজনৈতিক হিংসায় (Political Violence) প্রাণ হারিয়েছেন পরিবারের সদস্য। সেই শোকের মধ্যেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বহু পরিবার। এবার সেই পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে সরকারি চাকরি (Government Jobs) দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোল রাজ্য সরকার (State Government)। আগেই এই ঘোষণা করা হয়েছিল, তবে এবার কারা চাকরি পাবেন, কী যোগ্যতা লাগবে, পরিবারের মাসিক আয় কত হতে হবে, কোথায় আবেদন করতে হবে এবং কীভাবে হবে নিয়োগ—সমস্ত বিষয় জানিয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করল নবান্ন (Nabanna)।
রাজ্য সরকারের এই বিশেষ প্রকল্পের নাম ‘West Bengal Scheme for Providing Government Employment (Group D Post) to one Eligible Family Member of the Victims killed in Political Violence, 2026’। অর্থাৎ, রাজনৈতিক হিংসায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের একজন যোগ্য সদস্যকে সরকারি গ্রুপ-ডি পদে চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। এবার সেই ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন প্রকাশ করা হল। আর এই নির্দেশিকা সামনে আসতেই চাকরির সুযোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
কারা পাবেন?
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের একজন যোগ্য সদস্য এই প্রকল্পে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন। নিহত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে এবং তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান আবেদন করতে পারবেন। দত্তক সন্তানদেরও এই সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদিকে, নিহত ব্যক্তি অবিবাহিত হলে তাঁর উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ভাই বা বোন আবেদন করতে পারবেন। তবে সেক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক অসহায়ত্ব এবং চাকরির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হবে।
কোথায় চাকরি?
এই প্রকল্পে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতর, ডিরেক্টরেট, জেলাশাসকের কার্যালয়-সহ একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগ করা হবে। প্রয়োজনে এই বিশেষ প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত গ্রুপ-ডি পদও তৈরি করতে পারে রাজ্য সরকার। তবে এই নিয়োগের ফলে সাধারণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও প্রভাব পড়বে না বলে নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে।
বয়স ও যোগ্যতা?
চাকরির জন্য আবেদন করতে হলে ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে হবে। অষ্টম শ্রেণির সমতুল্য শিক্ষাগত যোগ্যতাও গ্রহণযোগ্য। বয়সের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি অনুযায়ী আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। পাশাপাশি গ্রুপ-ডি পদের নির্ধারিত সর্বোচ্চ বয়সসীমাও মানতে হবে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা স্তরের কমিটি বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে। সেই ছাড় দেওয়া হবে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে রাজ্য সরকার।
আয়ের শর্ত?
এই প্রকল্পে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি হলে আবেদন গ্রহণ করা হবে না। পরিবারের কোনও সদস্য নিয়মিত সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকলেও এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে না। এমনকী পরিবারের কোনও সদস্য আয়কর দিলেও সেই পরিবার এই বিশেষ নিয়োগের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
কারা বাদ পড়বেন?
একটি পরিবার থেকে শুধুমাত্র একজন সদস্যই এই বিশেষ নিয়োগের সুযোগ পাবেন। একই রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের কেউ আগে সরকারি চাকরি অথবা সহানুভূতিশীল নিয়োগ পেয়ে থাকলে নতুন করে এই প্রকল্পে চাকরি দেওয়া হবে না। এছাড়া রাজনৈতিক হিংসার কারণে মৃত্যু হয়েছে, তার প্রমাণ দিতে হবে। এফআইআর, চার্জশিট এবং আদালতে অভিযোগ গঠনের সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক এবং পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে।
কী কী নথি লাগবে?
চাকরির জন্য আবেদন করতে হবে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকের কাছে। নির্ধারিত আবেদনপত্র পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। আবেদনের সঙ্গে দিতে হবে নিহত ব্যক্তির মৃত্যুর শংসাপত্র, তাঁর সঙ্গে আবেদনকারীর সম্পর্কের প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ঘটনার এফআইআর, চার্জশিট এবং আদালতে অভিযোগ গঠনের সংক্রান্ত নথি। আবেদনকারীর যোগ্যতা ও পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথিও চাওয়া হতে পারে।
যাচাই হবে কীভাবে?
প্রতিটি জেলায় আবেদন যাচাইয়ের জন্য বিশেষ স্ক্রিনিং কমিটি তৈরি করা হবে। জেলাশাসকের নেতৃত্বে এই কমিটিতে থাকবেন পুলিশ সুপার অথবা সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিক এবং স্বরাষ্ট্র দফতরের মনোনীত একজন আধিকারিক। আবেদন জমা পড়ার পর কমিটি সমস্ত নথি খতিয়ে দেখবে। প্রয়োজনে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে তদন্তও করা হতে পারে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, আবেদন পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে যাচাইয়ের কাজ শেষ করে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের কাছে সুপারিশ পাঠাতে হবে জেলা কমিটিকে।
আপিলের সুযোগ
জেলা স্তরের কমিটির সিদ্ধান্তে কোনও আবেদনকারী সন্তুষ্ট না হলে তাঁর জন্য আপিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে রাজ্য স্তরের কমিটির কাছে আবেদন জানানো যাবে। তবে বিশেষ কোনও কারণ থাকলে ৩০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও আপিল গ্রহণ করতে পারবে রাজ্য স্তরের কমিটি।
আপিল জমা পড়ার পর সাধারণভাবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে তার নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে। এই রাজ্য স্তরের কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন স্বরাষ্ট্র দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব অথবা প্রধান সচিব। পাশাপাশি আইন ও অর্থ দফতরের আধিকারিক এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদেরও কমিটিতে রাখা হবে।
নিয়োগের নিয়ম?
সব নথি যাচাই এবং সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরই নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। তবে তার আগে আবেদনকারীকে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং মেডিক্যাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বাড়ির কাছাকাছি কর্মস্থলে পোস্টিং দেওয়ার চেষ্টা করবে রাজ্য সরকার। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে পরিবারের অন্য নির্ভরশীল সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার জমা দিতে হবে। এই প্রকল্পে যাঁরা চাকরি পাবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ, প্রবেশন, পদোন্নতি এবং অন্যান্য চাকরির শর্ত সাধারণ গ্রুপ-ডি কর্মীদের মতোই হবে।
শেষ তারিখ কবে?
এখানে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি এককালীন বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা। অর্থাৎ, প্রকল্পের সমস্ত যোগ্যতা পূরণ করলেই যে চাকরি নিশ্চিত, এমনটা নয়। শূন্যপদের সংখ্যা, জেলা কমিটির সুপারিশ এবং রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতেই নিয়োগ করা হবে। নির্ধারিত সময়সীমার পরে জমা পড়া আবেদন গ্রহণ করা হবে না। তবে আবেদনের শেষ তারিখ রাজ্য সরকার পরবর্তী সময়ে আলাদাভাবে নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক হিংসায় পরিবারের সদস্যকে হারানো মানুষদের জন্য সরকারি চাকরির একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করল রাজ্য সরকার। তবে এই সুযোগ পেতে হলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণের পাশাপাশি একাধিক নথি যাচাইয়ের ধাপ পার করতে হবে। এখন নজর থাকবে, কবে থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত কতগুলি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় সরকারি চাকরি পায়।


