Aaj India Desk, কলকাতা: আদালতের নির্দেশ থেকে শুরু করে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তৎপরতা—কোনও কিছুতেই এখনও দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি টুলু মণ্ডল (Tulu Mondal), বিনয় মিশ্র (Binoy Mishra) এবং প্রাক্তন বিডিও প্রশান্ত বর্মনকে (Prasanta Barman)। তিনজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু তদন্তকারীদের নাগালের বাইরে থেকে তাঁরা বিদেশে রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। ফলে তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলকে দেশে ফেরাতে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির সাহায্য নিতে চাইছে সিবিআই। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে টুলুর জামিন সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে কেন্দ্রের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই সম্ভাবনার কথা জানান। এর আগে একই পদ্ধতিতে দুবাই থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল আফতাব আনসারিকে।
২০০১ সালে খাদিম কর্তা পার্থ রায় বর্মনকে অপহরণের ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল আফতাবের। পরের বছর জানুয়ারিতে আমেরিকান সেন্টারে হামলার ঘটনায় কয়েকজন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর আফতাব দুবাইয়ে পালিয়ে যান। তবে পরের মাসেই বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কায়েশ বেগের মতে, একই আইনি পথ অনুসরণ করে টুলুকেও দেশে ফেরানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, প্রশান্ত বর্মন নেপালে রয়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। আর বিনয় মিশ্র বর্তমানে ভানুয়াতুর নাগরিক। ওই দ্বীপরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেওয়ার পর তিনি দুবাই ও লন্ডনে যাতায়াত করছেন বলে জানা যাচ্ছে। টুলুর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। প্রশান্তর বিরুদ্ধে রয়েছে খুনের মামলা। অন্যদিকে, কয়লা ও গোরু পাচার-সহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিনয়। তিনজনেরই বিদেশে চলে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশে না ফেরার বিষয়টি তদন্তকারী সংস্থাগুলির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টুলু মণ্ডলের দেশ ছাড়ার ঘটনা সামনে আসে বীরভূমে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হওয়ার পর। একটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদনও খারিজ করে দিয়েছিল। এরপর তাঁর মামলার শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চে জটিলতা তৈরি হয়। পরে মামলাগুলি বিচারপতি অজয় মুখোপাধ্যায়ের এজলাসে পাঠানো হয়। কিন্তু রস্টার পরিবর্তনের কারণে বিচারপতি জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে চলে যাওয়ায় নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সেই সময় টুলুর আইনজীবীরা জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে গিয়ে দ্রুত শুনানির আবেদন জানান। আদালত সম্মতি দেওয়ায় ৭ অক্টোবর কলকাতা থেকে সেখানে গিয়ে মামলার শুনানিতে অংশ নেন তাঁরা। তবে গত ২৯ অক্টোবর শুনানি চলাকালীন কয়েকজন আইনজীবী এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, প্রধান বিচারপতির অনুমতি ছাড়া কলকাতা হাইকোর্টের প্রিন্সিপাল বেঞ্চের মামলা সার্কিট বেঞ্চে শুনতে পারে না।
পাশাপাশি, পুজোর সময় সার্কিট বেঞ্চে এমনিতেই মামলার চাপ থাকায় কলকাতার মামলা সেখানে পাঠানোর আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। পরিস্থিতির জেরে ওই দিন শুনানি স্থগিত হয়ে যায়। এরপর হাইকোর্টের পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন টুলু। আগামী ৩ নভেম্বর তাঁর মামলার শুনানি হওয়ার কথা।
তবে বিনয় মিশ্রকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা আরও বেশি। কারণ, তিনি বর্তমানে ভানুয়াতুর নাগরিক। ভারতের সঙ্গে ওই দেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় তাঁকে ফেরানো সহজ নয়। যদিও তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে ইডি ও সিবিআই। গত অগস্টে এই দুই সংস্থা দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে। বিনয়কে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি চাওয়া হয়েছে সেখানে। একসময় রাজ্যের শাসকদলের এক শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। তাঁর বিদেশে চলে যাওয়ার পিছনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য সামনে আসেনি।
অন্যদিকে, প্রাক্তন বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন কিছুটা আলাদা। সল্টলেকের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মামলায় তাঁর নাম জড়ায়। তাঁকে একাধিকবার আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিকে জামিন পেলেও পরে কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট তাঁর গ্রেফতারির নির্দেশ দেয়। কিন্তু তারপরেও তাঁকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই খুনের ঘটনায় তদন্তের চার্জশিটে তাঁর নাম রাখা হয়নি বলে জানা গিয়েছে।
এমনকি গত ২৫ মে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর অভিযোগে প্রশান্তকে গ্রেফতার করা হলেও পরে তাঁকে আটকে রাখা যায়নি। বর্তমানে তিনি নেপালে রয়েছেন বলে গোয়েন্দাদের অনুমান। তাঁকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে তিন অভিযুক্তকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাঁরা দেশের বাইরে রয়েছেন? বিদেশে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পরেও দেশে ফেরাতে এত সময় লাগছে কেন? আর তাঁদের পিছনে এমন কোনও প্রভাবশালী মহলের সাহায্য রয়েছে কি না, যা তদন্তের পথে বাধা তৈরি করছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছেন আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।


