Aaj India Desk, পূর্ব বর্ধমান: পূর্ব বর্ধমানের নবাবহাটে (Nababhat) একটি বেসরকারি নার্সিংহোম (Nursing home)-কে ঘিরে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি তৈরি হল। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে এক প্রসূতির মৃত্যুর পর শুক্রবার সকালে উত্তেজিত জনতা নার্সিংহোমে ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীও (Central Force) মোতায়েন করা হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে নবাবহাট বালিঘাট মোড় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইতিমধ্যেই নার্সিংহোমের মালিক-সহ তিন কর্মীকে আটক করেছে বর্ধমান থানার পুলিশ। শুরু হয়েছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
পরিবারের দাবি, বৃহস্পতিবার রাতে সিজার (C-section) করার জন্য ওই গৃহবধূকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল। অপারেশনের সময় আচমকাই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এরপর দ্রুত মা ও সদ্যোজাত শিশুকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে শুক্রবার ভোরে সেখানে ওই মহিলার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলকোট এলাকার বাসিন্দা ২৩ বছরের রিজিয়া খাতুন প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে ওই নার্সিংহোমে ভর্তি হন। পরিবারের দাবি, সুস্থ অবস্থাতেই তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। মৃতার মা অভিযোগ করেন, “আমার মেয়েকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে ‘মা মা’ করে চিৎকার করছিল। আমরা বারবার জানতে চেয়েছি কী হয়েছে, কিন্তু কেউ কিছু বলেনি। আমাদের হাতজোড় করে অনুরোধ করলেও কোনও তথ্য দেয়নি নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ। শুধু বলেছে প্রেসার বেড়েছে, ঠিক হয়ে যাবে। শেষে আমার মেয়েকে ওরা কুরবানী দিয়ে দিল!”
মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা এবং চরম অবহেলার কারণেই এই মৃত্যু হয়েছে। ক্ষুব্ধ জনতা লাঠি-বাঁশ নিয়ে নার্সিংহোমে ঢুকে জানালার কাচ, আসবাবপত্র ও রিসেপশন ভেঙে দেয়। নার্সিংহোমের কয়েকজন কর্মীকেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। আতঙ্কে সেখানে ভর্তি থাকা অন্য রোগীরাও দ্রুত বেরিয়ে আসেন।
খবর পেয়ে বর্ধমান থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উত্তেজনা বেশি থাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও নামানো হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় চাপা উত্তেজনা রয়েছে। মৃতদেহের ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে ঘটনার তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৃতার মামা শেখ আলম গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তাঁর ভাগ্নিকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁর। এমনকি ব্যথায় কাঁদতে শুরু করলে তাঁকে চড় মারা হয় বলেও অভিযোগ। অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলেও অনেক দেরিতে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে পরিবারের দাবি। এছাড়াও জনতার রোষের মুখে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ অন্য রোগীদের ফেলে পালিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে নার্সিংহোমের পক্ষ থেকে ডা. প্রণয় ঘোষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনেই সিজার করা হয়েছিল এবং নিয়ম মেনেই চিকিৎসা চলছিল। রোগিনীর খিঁচুনি শুরু হলে তাঁকে দ্রুত মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়। পরে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, ভুল বোঝাবুঝির জেরে রোগীর পরিজনেরা হামলা চালিয়ে কর্মীদের হেনস্থা করেছেন। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে রোগী ভর্তি করা কঠিন হবে।
পূর্ব বর্ধমানের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডা. জয়রাম হেমব্রম জানিয়েছেন, অভিযোগ পেলে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তদন্ত করা হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমস্ত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি জেলা স্তরের দুই কমিটিতে এই ঘটনার পর্যালোচনাও করা হবে।


