Aaj India Desk, কলকাতা: তারাপীঠের হোটেলে আগুনে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা এখনও মানুষের মনে তাজা। এর মধ্যেই কলকাতার নিউমার্কেটে (New Market) আরও একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে (Fire) প্রাণ গেল ৯ জনের। বুধবার গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পুরনো বহুতলে আগুন লাগে। প্রাথমিক তদন্তে এসির শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আগুন কীভাবে লাগল, তার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এমন একটি ঘিঞ্জি ভবনে একসঙ্গে এতগুলি হোটেল চালানোর অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল?
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, এভাবে হোটেল চালানো চলতে পারে না। কেন এমন ভবনে হোটেলগুলিকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে। এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনায় কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন মন্ত্রী।
এক বাড়িতে ছ’টি হোটেল
মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই পাঁচতলা বাড়িতে ঢোকার রাস্তা মাত্র পাঁচ ফুটের মতো চওড়া। প্রবেশপথের দুই পাশে রয়েছে কলাপসিবল গেট। সেখানে একসঙ্গে ছ’টি হোটেলের বোর্ড দেখা যায়।।ভবনের ভিতরের অবস্থা আরও চিন্তার। ছোট জায়গার মধ্যে তৈরি করা হয়েছে একের পর এক ঘর। কোথাও ঘরের মধ্যে আবার ছোট ঘর। পাঁচতলায় ওঠার জন্য রয়েছে সরু ও বাঁকানো লোহার সিঁড়ি। সিঁড়ির সামনে প্রায় দেড় ফুটের মতো সরু জায়গা রয়েছে। ফলে আগুন বা অন্য কোনও বিপদের সময় একসঙ্গে অনেক মানুষ বেরিয়ে আসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। ভবনটিতে কোনও বাইরের জরুরি সিঁড়িও ছিল না।
আগুনের সময় ঘুমোচ্ছিলেন আবাসিকরা
জানা গিয়েছে, রাত আড়াইটে নাগাদ হোটেলে আগুন লাগে। সেই সময় অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারলেও ৯ জন আর বাইরে বেরোতে পারেননি। প্রাথমিকভাবে দমবন্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
ঘটনার পর আশপাশের হোটেলগুলিতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক আবাসিক নিরাপত্তার কথা ভেবে হোটেল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। নিউমার্কেট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে ফরেন্সিক দল।
মৃতদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত একজনের পরিচয় জানা গিয়েছে বলে সূত্রের খবর। তিনি ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। তবে তাঁর পরিচয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
আগের অগ্নিনিরাপত্তা অডিটের কী হল?
নিউমার্কেটের এই ঘটনার পর কলকাতার হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে পুরনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। এর আগেও জোড়াসাঁকোয় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার হোটেলগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি অডিট কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। চারটি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতায় প্রায় ৩৭৮৮টি হোটেল রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় মাত্র ১৫ থেকে ২০টি হোটেলের অডিট করা সম্ভব হয়েছিল। পরে বাইরের সংস্থার সাহায্য নিয়ে বাকি হোটেলগুলিরও অডিট করার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেই কাজ শেষ পর্যন্ত এগোয়নি। রিপোর্টও পুরসভা বা দমকলের কাছে জমা পড়েনি। চারটি বৈঠকের পর কার্যত বন্ধ হয়ে যায় পুরো প্রক্রিয়া।
দমকলের কর্মীসংখ্যা কম থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তাঁর বক্তব্য, হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা দেখার দায়িত্ব দমকলের। তাই ট্রেড লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগেও উঠছে প্রশ্ন
স্থানীয়দের দাবি, একসময় ওই এলাকায় সাধারণ মানুষ বসবাস করতেন। পরে ধীরে ধীরে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে যায়। এরপর দু’টি পুরনো বাড়িকে একসঙ্গে যুক্ত করে সেখানে হোটেল ব্যবসা শুরু হয়।
নিউমার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ডের পর তাই একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। পর্যাপ্ত বেরনোর রাস্তা, জরুরি সিঁড়ি বা প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কীভাবে এমন ভবনে একের পর এক হোটেল চলছিল? নিয়মিত নজরদারি কেন হয়নি? আর আগের অডিটের কাজই বা কেন শেষ হল না?নিউমার্কেটের ৯টি প্রাণহানির পর এখন এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজাই সবচেয়ে জরুরি।


