28 C
Kolkata
Wednesday, April 15, 2026
spot_img

স্ক্রিনে ‘পারফেক্ট’, আয়নায় ‘অচেনা’—এই কি আমাদের ‘আমি’?

SPECIAL FEATURE

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে এখন অনেকেরই অস্বস্তি হয়। কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে ফিল্টার (Filter) লাগানো ছবি দেখলে মনে হয়-“এই তো আমি!” এই বাস্তব (Real) আর ভার্চুয়াল (Virtual)এই ফারাকটাই আজকের দিনের বড় সংকট। জানেন বর্তমানে ভারতে স্কিন ব্রাইটনিং প্রোডাক্টের বাজার ইতিমধ্যেই ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল অঙ্ক শুধু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর সামাজিক ও মানসিক সঙ্কটের কাহিনি।

একটা সময় ছিল যখন মানুষ আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিকেই নিজের পরিচয় হিসেবে মেনে নিত। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করেছে ডিজিটাল স্ক্রিন। ফিল্টার, এডিট, রিটাচ-এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক কৃত্রিম ‘পারফেক্ট’ চেহারা, যা ধীরে ধীরে বাস্তবের ‘আমি’-কে আড়াল করে দিচ্ছে।

সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা: ফিল্টার বনাম বাস্তব

ডিজিটাল যুগে সৌন্দর্যের মানদণ্ড আমূল বদলে গেছে। ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাটের ফিল্টার আমাদের এমন এক ‘পারফেক্ট’ চেহারা দেখায়, যেখানে ত্বক নিখুঁত, মুখের গঠন নির্ভুল, আর কোনও ত্রুটি নেই। কিন্তু একটু ভেবে বলুন তো, বাস্তব জীবনে এমন ‘পারফেকশন’ আদৌ সম্ভব কি সম্ভব?

আর এই অমিল থেকেই তৈরি হচ্ছে আত্মসন্দেহ। নিজের স্বাভাবিক চেহারাকে অস্বীকার করার প্রবণতা বাড়ছে। অনেকেই এখন ফিল্টার ছাড়া ছবি তোলার কথা ভাবতেই পারেন না। মনোবিদদের মতে, এই ভার্চুয়াল পারফেকশনই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিচ্ছে-মানুষ নিজের মতো থাকতে ভয় পাচ্ছে, নিজের আসল সত্ত্বাকে লুকিয়ে ফেলছে।

বডি শেমিং: মজার আড়ালে নির্মমতা

‘রোগা মানে শুটকি”, “মোটা মানে মুটকি”-এই কথাগুলো আমাদের সমাজে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধিই করি না। বন্ধুর আড্ডা, পরিবারের কথোপকথন, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার মন্তব্য-সব জায়গাতেই শরীর নিয়ে ঠাট্টা যেন নিত্যদিনের বিষয়।

কিন্তু গবেষণা বলছে, এই তথাকথিত ‘মজা’ আসলে গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করে। বডি শেমিং শুধু মুহূর্তের কষ্ট নয়-এটি দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়, নিজের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে, এমনকি ইটিং ডিসঅর্ডার ও ডিপ্রেশনের কারণও হতে পারে।

একটা ছোট্ট মন্তব্য, এক ঝলক তাচ্ছিল্য-কারো মনের ভিতর এমন ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা সারাজীবন বহন করতে হয়। অথচ আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না, আমাদের বলা একটি শব্দ অন্য কারো জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্ণবৈষম্য: আধুনিকতার মুখোশে পুরনো মানসিকতা

আমরা নিজেদের আধুনিক বলে দাবি করি, কিন্তু বাস্তব ছবি এখনও অনেকটাই ভিন্ন। আজও বিয়ের বিজ্ঞাপন হোক বা চাকরির ইন্টারভিউ-ফর্সা গায়ের রঙকেই বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। “ফেয়ার অ্যান্ড বিউটিফুল”-এই ধারণা বহুদিন ধরেই আমাদের সমাজে গেঁথে গেছে।

গায়ের রঙ নিয়ে কটূক্তি, বিদ্রূপ বা বুলিং বহু ক্ষেত্রে মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত করছে। সামাজিক সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই বর্ণবৈষম্য তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে চরম হতাশার দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই মানসিকতাকে আমরা অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিই। ফলে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাই অনুভূত হয় না।

সোশ্যাল মিডিয়া ও ‘পারফেক্ট লুক’-এর চাপ

প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘পারফেক্ট’ ছবি দেখে বড় হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। নিখুঁত ত্বক, আদর্শ শরীর, সাজানো জীবন-এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক অবাস্তব মানদণ্ড, যার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছে তরুণ-তরুণীরা।

গবেষণা বলছে, প্রতি তিনজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন বডি ডিসমরফিয়া বা ডিপ্রেশনের সমস্যায় ভুগছে, যার বড় কারণ এই অবাস্তব সৌন্দর্যের চাপ। অনেকেই নিজের চেহারা নিয়ে এতটাই অস্বস্তিতে ভোগেন যে, আয়নায় তাকাতেও সংকোচ বোধ করেন।

ফিল্টার-নির্ভর এই জগতে বাস্তব মুখ যেন ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাচ্ছে। ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’-এর উপর নির্ভর করে তৈরি হচ্ছে আত্মমূল্যবোধ, যা অত্যন্ত ভঙ্গুর।

বিউটি ইন্ডাস্ট্রির কৌশল: ‘অসম্পূর্ণতা’ থেকে ব্যবসা

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিউটি ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসায়িক কৌশল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং মনস্তাত্ত্বিক। প্রথমে মানুষকে বোঝানো হয়-“তুমি যথেষ্ট সুন্দর নও, তোমার আরও উন্নতি দরকার”।

তারপর সেই ‘অসম্পূর্ণতা’ ঢাকার সমাধান হিসেবে বাজারে আসে নানা ক্রিম, সিরাম, ট্রিটমেন্ট। ধীরে ধীরে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই পণ্যগুলো ছাড়া সে ‘সম্পূর্ণ’ নয়।

ফলে তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র-অসন্তোষ থেকে কেনাকাটা, আর সেই কেনাকাটা থেকে আরও বেশি নির্ভরতা। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, আর সেই শূন্যতাকেই পুঁজি করে বাড়ে কোম্পানিগুলির ব্যবসা।

সবচেয়ে বড় শিকার: টিনেজ প্রজন্ম

এই পুরো চক্রের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা জানেন? কিশোর-কিশোরীরা। তাদের মানসিকতা এখনও গড়ে উঠছে, আত্মপরিচয় এখনও স্থির নয়। সেই সময়েই তারা ‘পারফেক্ট’ হওয়ার চাপের মুখে পড়ছে।

নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে করতে তারা ভুলে যাচ্ছে-প্রত্যেক মানুষ আলাদা। এই তুলনা থেকেই জন্ম নিচ্ছে হীনমন্যতা, আত্মসন্দেহ এবং অনেক ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন। তাদের মনে ঢুকে যাচ্ছে এক বিপজ্জনক ধারণা-“আমি যেমন, তেমনটা যথেষ্ট নয়।”

সমাধানের পথ: মানসিকতার পরিবর্তনই আসল

মনোবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হল মানসিকতার পরিবর্তন। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে হবে।

গায়ের রং, শরীরের গঠন বা মুখের আদল নয়- মানুষের কাজ, ব্যক্তিত্ব, চিন্তাধারা এবং দক্ষতাই প্রকৃত সৌন্দর্যের পরিচয়। নিজেকে গ্রহণ করা এবং অন্যকে তার মতো করে সম্মান করা-এই দুটি অভ্যাসই সমাজকে আরও সুস্থ করে তুলতে পারে।

পরিবার, শিক্ষা এবং সমাজ-সব ক্ষেত্রেই এই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, যাতে আগামী প্রজন্ম নিজেদের নিয়ে গর্ব করতে শেখে, লজ্জা নয়। কারণ, প্রকৃত সৌন্দর্য কখনও ফিল্টারের ওপর নির্ভর করে না-তা তৈরি হয় আমাদের চিন্তায়, আমাদের আচরণে, আমাদের মানবিকতায়।

আর আজ সময় এসেছে ফিল্টারের বাইরে এসে বাস্তবকে গ্রহণ করার। নিজেকে নতুন করে দেখার, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার। আর নিজেকে বলার- “আমি যেমন, তেমনই যথেষ্ট।”

                পূরবী প্রামাণিক

 

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন