কাঠমান্ডু: ২২ আগস্ট সন্ধ্যাবেলা। আর পাঁচটা দিনের মতোই হিমালয়ের দেশ নেপালের কাভরেপালানচোকের পঞ্চখাল এলাকার এক প্রাচীন মন্দিরে আরতি করতে যান পুরোহিত! কিন্তু দেবীর মুখের দিকে তাকিয়েই হতবাক হয়ে যান তিনি! ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানে (Nepal Flash flood) ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ফের সামনে এসেছে সেই ঘটনার কথা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় পালানচক ভগবতী মন্দিরের পুরোহিত সন্ধ্যা আরতির সময় প্রতিমার শরীরে লক্ষ করেন বিন্দু বিন্দু ঘাম! ওই পুরোহিতের কথায়, যা দেখে কোনও অমঙ্গল আসন্ন বলে আশঙ্কা করে মন্দিরে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ আচারও পালন করা হয়। আর তার ঠিক চার দিন পরেই নেপালের একাধিক এলাকায় নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয় (Nepal Flash flood)।
দেবীর ‘ঘাম’ মানেই বিপদের সংকেত?
পঞ্চখালের পালানচক ভগবতী মন্দিরকে ঘিরে বহু পুরনো লোকবিশ্বাস রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, বড় কোনও দুর্যোগ বা অমঙ্গল আসার আগে দেবী নাকি এভাবেই ‘ঘামতে’ শুরু করেন। তাঁদের কাছে এটি শুধুই জলকণা নয়! দেবীর কান্না, কিংবা মানুষকে সতর্ক করার এক অলৌকিক সংকেত।
এই বিশ্বাস আজকের নয়। স্থানীয়দের দাবি, বহু বছর ধরেই বড় বিপর্যয়ের আগে প্রতিমায় এমন লক্ষণ দেখা গিয়েছে। এমনকী প্রাচীন নেপালের রাজপরিবারের মধ্যেও এই বিশ্বাস ছিল বলে দাবি করা হয়। কোনও মন্দিরে দেবী ‘ঘামলে’ রাজাকে বিশেষ পুজো ও ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হত।
ভূমিকম্প থেকে রাজপ্রাসাদ—আগেও কি মিলেছিল সংকেত?
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৯৭৪ ও ১৯৮৭ সালের ভূমিকম্পের আগেও দেবী ভগবতীর প্রতিমায় একই ধরনের জলকণা দেখা গিয়েছিল। শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, ২০০১ সালের রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ডের আগেও দেবীর প্রতিমা ‘ঘেমে উঠেছিল’ বলে দাবি স্থানীয়দের। তাই এবার ২২ আগস্টের সেই দৃশ্য এবং তার চার দিন পরের ভয়াবহ বন্যাকে (Nepal Flash flood) পাশাপাশি রেখে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। তবে কি সত্যিই কোনও আগাম সংকেত ছিল? নাকি নিছক কাকতালীয় ঘটনা?
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও রয়েছে
রহস্যের পাশাপাশি রয়েছে বিজ্ঞানের যুক্তিও। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্ষাকালে মন্দিরের ভিতরে বাতাসে আর্দ্রতা অনেক বেড়ে যায়। ঠান্ডা পাথরের প্রতিমার গায়ে তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণা তৈরি করতে পারে। সেই জলকণাকেই ভক্তদের চোখে ‘ঘাম’ বলে মনে হতে পারে। অর্থাৎ, বিজ্ঞানের কাছে এর ব্যাখ্যা যথেষ্ট স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বাসের জগতে হিসাবটা অন্যরকম। যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কাছে দেবীর এই ‘ঘাম’ এখনও এক গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা। বিপর্যয়ের (Nepal Flash flood) পর সেই বিশ্বাস আরও জোরালো হয়েছে।
ধ্বংসের মাঝে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে (Nepal Flash flood) শেষ পাওয়া হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৯০৩, নিখোঁজ ৪২৪৭ জন। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় ৩৬৫৫ জন এবং বিদেশি ৫৯২ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিব্বতেও ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৩ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর রয়েছে। এই ভয়াবহতার মাঝে তাই পালানচক ভগবতীর সেই কয়েক ফোঁটা জল যেন নতুন এক গল্পের জন্ম দিয়েছে। দেবীর সতর্কবার্তা, নাকি বর্ষার আর্দ্রতায় জমে থাকা জলীয়বাষ্প? বিজ্ঞান তার উত্তর দিতে পারে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস? সেটা হয়তো আরও অনেক দিন ধরেই এই রহস্যের গল্প বলে যাবে।


