30 C
Kolkata
Thursday, August 20, 2026
spot_img

‘কালীঘাট’ ছেড়ে ‘আসল তৃণমূলে’, তবু কাটলো না কাঁটা! কাজলের জেলা পরিষদ ছাড়ার নেপথ্যে কি সেই অনুব্রত-ফ্যাক্টর?

বীরভূম: অবশেষে বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতির চেয়ার ছাড়লেন ফয়জুল হক ওরফে কাজল শেখ (Kajal Sheikh)। প্রশাসনিকভাবে কারণটি স্পষ্ট, নিজের সিদ্ধান্তে, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে বর্ধমান ডিভিশনের ডিভিশনাল কমিশনার তথা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ তাঁর ইস্তফাপত্র গ্রহণ করে তা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।

কিন্তু রাজনীতির অঙ্কে এখানেই গল্প শেষ হচ্ছে না। বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে প্রশ্ন, কাজল শেখ (Kajal Sheikh) কি সত্যিই শুধু ব্যক্তিগত কারণেই সরে দাঁড়ালেন, নাকি বীরভূমের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ তাঁকে এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিল?

১৯টি সই, তারপর ইস্তফা

প্রসঙ্গত, কাজলের পদত্যাগের ঠিক আগে জেলা পরিষদে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা পড়েছিল। ৫২ সদস্যের মধ্যে ১৯ জন তাতে সই করেন। রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ ওই সদস্যদের অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রশাসনিক নথিতে ‘অনাস্থা’ এবং ‘পদত্যাগ’ দুটি আলাদা ঘটনা হলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে দুটির সময়কালই প্রশ্ন তুলছে।

কাজল শেখ ১৯ আগস্ট পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরদিন তাঁকে (Kajal Sheikh) ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। শুনানিতে তিনি জানান, নিজের ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর উপর কোনও চাপ বা জবরদস্তি ছিল না। কর্তৃপক্ষ তাঁর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়ে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে। ফলে আইনি বা প্রশাসনিক দিক থেকে বিষয়টি আপাতত পরিষ্কার। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নটি এখনও খোলা।

‘জেলা পরিষদে যাওয়া’ নিয়ে বিতর্ক

কাজল শেখের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জেলা পরিষদের কাজে তাঁর অনুপস্থিতি। রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি নিয়মিত জেলা পরিষদে যাচ্ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে। এর জেরে স্থায়ী সমিতির বৈঠক এবং পরিষদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।

সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় প্রশাসনিক অচলাবস্থার অভিযোগ। আর সেই পরিস্থিতির মধ্যেই অনাস্থা প্রস্তাব সামনে আসে। অর্থাৎ, তাঁর ইস্তফার পিছনে যদি কোনও রাজনৈতিক কারণ থেকেও থাকে, তার সঙ্গে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক অস্বস্তির প্রশ্নটিও জড়িয়ে রয়েছে।

দল বদলালেই কি সমীকরণ বদলায়?

কাজল শেখের রাজনৈতিক অবস্থান বদলের ইতিহাসই এই ঘটনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূলে যোগ দেন। রাজনৈতিকভাবে তাঁর দলবদলকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই নানা হিসাব শুরু হয়েছিল।

কিন্তু নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে গেলেও বীরভূমের পুরনো সংঘাতের ছায়া পুরোপুরি কাটেনি বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। বিশেষ করে অনুব্রত মণ্ডলের (Anubrata Mondal) সঙ্গে কাজল শেখের (Kajal Sheikh) দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ বীরভূমের রাজনীতিতে বহুবার আলোচনায় এসেছে। এবার জেলা পরিষদের অনাস্থা প্রস্তাবে অনুব্রত-ঘনিষ্ঠদের উপস্থিতির দাবি সেই পুরনো দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

বীরভূমের ভোটের অঙ্কও বদলেছে

এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে সাম্প্রতিক বিধানসভা ফলাফল। বীরভূমের ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ছয়টিতে বিজেপি এবং পাঁচটিতে তৃণমূল জয়ী হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হাসন কেন্দ্র থেকে জয়ী হন কাজল শেখ। অর্থাৎ, যে জেলায় একসময় তৃণমূলের সাংগঠনিক আধিপত্য নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন থাকত না, সেখানে এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি তীব্র। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও আগের মতো থাকার কথা নয়।

আর সেখানেই কাজল শেখের (Kajal Sheikh) জেলা পরিষদ-ইস্তফা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদ ছাড়ার ঘটনা না হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।

চেয়ার গেল, অঙ্ক বাকি

প্রশাসনিক নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জেলা পরিষদের সভাধিপতির দায়িত্ব নির্বাহী আধিকারিকের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। নথি, রেজিস্টার, সিলমোহর এবং পরিষদের অন্যান্য সম্পত্তিও হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চেয়ারটি আপাতত খালি হওয়ার পথে।

কিন্তু আসল রাজনৈতিক প্রশ্ন চেয়ার খালি হওয়া নয়, এরপর সেই চেয়ারে কে বসবেন এবং তাঁকে বসাতে কোন সমীকরণ তৈরি হবে? কাজল শেখের (Kajal Sheikh) ইস্তফা যদি নিছক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে ঘটনাটি সেখানেই শেষ হতে পারে। কিন্তু যদি এর পিছনে জেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ শক্তির লড়াই এবং বীরভূমের পুরনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে, তাহলে এই ইস্তফা হয়তো বড় কোনও পুনর্বিন্যাসের প্রথম ধাপ।

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অনুব্রত মণ্ডলের (Anubrata Mondal) সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতই কাজল শেখের পদত্যাগের কারণ। প্রশাসনিক শুনানিতেও এমন কোনও কারণ তিনি জানাননি। তবে ১৯ জনের অনাস্থা, তার পরেই ইস্তফা এবং বীরভূমের পুরনো গোষ্ঠীসমীকরণ, এই তিনটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। কাজল শেখের (Kajal Sheikh) হাতে এখন জেলা পরিষদের চেয়ার নেই। কিন্তু বীরভূমের রাজনীতিতে তাঁর অধ্যায় যে শেষ হয়ে গেল, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন