নয়াদিল্লি: তিস্তার জল নিয়ে (Teesta Water Treaty) ফের সরগরম উপমহাদেশের কূটনীতি। একদিকে চিনের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে আবার ভারতকে ‘বন্ধুত্বের’ কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে ঢাকা! ‘প্রতিবেশী দেশ বন্ধু দেশ!’ কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বন্ধুত্বের এই বার্তার আড়ালে কি দিল্লির উপর কৌশলগত চাপ তৈরির চেষ্টা করছে তারেকের দেশ?
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যখন টানাপোড়েনের আবহেই তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের নতুন তৎপরতা নজর কাড়ছে। বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা তিস্তা জলবণ্টন চুক্তির (Teesta Water Treaty) জেরে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হোক, তা চায় না ঢাকা।
তবে একইসঙ্গে তাঁর বার্তাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, ভারত নিজের স্বার্থের কথা ভাববে, বাংলাদেশও নিজের স্বার্থ দেখবে। কিন্তু বন্ধু দেশের উচিত বন্ধুর স্বার্থও সুরক্ষিত রাখা। অর্থাৎ, বন্ধুত্ব থাকুক! কিন্তু তিস্তার জলও চাই।
চিন সফরে তারেক, আলোচনায় তিস্তা—তারপরই নতুন সমীকরণ?
তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের তৎপরতার পিছনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী পদে বসার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চিনে গিয়ে তিস্তা (Teesta Water Treaty) নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তারেক রহমান। চিনের জলসম্পদমন্ত্রী লি গুয়িংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা নদীর প্রসঙ্গও ওঠে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট অনুযায়ী, তিস্তা-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিস্তা রিভার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টে বাংলাদেশকে সহযোগিতার কথাও জানিয়েছে বেজিং।আর এখানেই তৈরি হচ্ছে কৌতূহল।
তিস্তার সিংহভাগ জলপ্রবাহ ভারতে, অথচ প্রকল্পের আলোচনায় সরাসরি চিনকে পাশে চাইছে ঢাকা। তাহলে কি বেজিংকে সামনে রেখে দিল্লির উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল? নাকি বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন থেকেই চিনের সাহায্য নেওয়া?
‘আমরাও আমাদের স্বার্থ ভাবছি’—ভারতকে বার্তা অ্যানির
চিনের সঙ্গে তিস্তা (Teesta Water Treaty) নিয়ে আলোচনা চলার মাঝেই ভারতের উদ্দেশে বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রীর মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অ্যানির বক্তব্যের সারকথা, প্রতিবেশী দেশ বন্ধু। ভারত যেমন নিজের স্বার্থ বিবেচনা করে, বাংলাদেশও নিজের স্বার্থ দেখবে। কিন্তু দুই বন্ধু দেশেরই একে অপরের স্বার্থের কথাও ভাবা উচিত। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক খারাপ হোক, ঢাকা তা চায় না।
কূটনৈতিক ভাষায় এই বার্তা যথেষ্ট মেপে দেওয়া। কিন্তু তার ভিতরে কি চাপের ইঙ্গিতও রয়েছে? চিনের সঙ্গে তিস্তা-সখ্য বাড়িয়ে একদিকে বেজিংকে বিকল্প সহযোগী হিসেবে সামনে আনা, অন্যদিকে দিল্লিকে ‘বন্ধুত্বের দায়িত্ব’ মনে করিয়ে দেওয়া, ঢাকার কৌশল কি দুই দিকেই দরজা খোলা রাখা?
তিস্তা প্রকল্পে ৫-৬ জেলার প্রত্যাশা, সামনে বড় পরীক্ষা
বাংলাদেশে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার জন্য একাধিক সেমিনার ও পরামর্শ বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যানি। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বিস্তারিত সমীক্ষা করা হবে। সমীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করেই প্রকল্প বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তাঁর দাবি, তিস্তা প্রকল্প শুধু নদী ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। নদীভাঙন-সহ একাধিক সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচ থেকে ছয়টি জেলার মানুষের কাছে এটি বড় প্রত্যাশার প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ওই অঞ্চলের মানুষের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে, এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছে তিস্তা এখন শুধু কূটনীতি নয়, রাজনৈতিক এবং জনস্বার্থেরও বড় ইস্যু।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে তিস্তা চুক্তি
তিস্তা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের টানাপোড়েন অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮০-র দশক থেকেই দুই দেশের মধ্যে জলবণ্টন (Teesta Water Treaty) নিয়ে আলোচনা চলছে। ১৯৮৩ সালের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে তিস্তার জলের ৩৯ শতাংশ ভারতের এবং ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয়েছিল। বাকি ২৫ শতাংশের ভাগ নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
২০১১ সালে শুষ্ক মরশুমে তিস্তার জলবণ্টন নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির খসড়া তৈরি হলেও তা শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের জলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি জানানোয় সেই চুক্তি (Teesta Water Treaty) আটকে যায়।
তিস্তার উৎস সিকিমে, নদী পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে ঢোকে এবং শেষে ব্রহ্মপুত্রে মিশে যায়। ফলে তিস্তা নিয়ে কোনও সমাধান করতে গেলে শুধু দিল্লি-ঢাকার সমীকরণ নয়, পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থও বড় ফ্যাক্টর।
আর সেই কারণেই তিস্তা নিয়ে নতুন করে চিনের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে বেজিং, অন্যদিকে দিল্লি, মাঝখানে তিস্তার জল। ঢাকার নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার।


