কলকাতা: রবিবাসরীয় সকালে চলচ্চিত্র জগতে আছড়ে পড়ল গভীর শোকের ছায়া। অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর প্রয়াত হলেন প্রবীণ চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজা সেন (Raja Sen) । স্বাধীনতা দিবসের ঠিক পরদিন, রবিবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৭১ বছরের পরিচালক। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশনের জগতে যেন একটি যুগের অবসান হল।
রাজা সেনকে (Raja Sen) মনে পড়লে সবার আগে ফিরে আসে ‘দামু’ (Damu)। ১৯৯৬ সালে এই ছবির হাত ধরেই পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে তাঁর আত্মপ্রকাশ। আর কী আশ্চর্য, তাঁর প্রথম ছবির নায়কই ছিল এমন এক মানুষ, যার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সরলতা। এক ছোট্ট মেয়েকে দেওয়া কথা রাখার জন্য যে মানুষ অজ পাড়াগাঁ থেকে হাতি খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিল। হাতি কোথায় পাওয়া যাবে, পথ কত কঠিন, সামনে কত বিপদ! কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। কারণ দামুর কাছে প্রতিশ্রুতি মানে ছিল প্রতিশ্রুতিই।
নানা জায়গায় ঘোরা, একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া, বিপদের মধ্যে পড়েও লক্ষ্য থেকে না সরা! দামুর সেই অভিযান আসলে হয়ে উঠেছিল মানুষের নিষ্পাপ বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং কথা রাখার এক অনন্য গল্প। রাজা সেনের নির্মাণে সেই সরল গল্প পেয়েছিল গভীর মানবিক আবেগ। দর্শকের মন ছুঁয়ে যাওয়া ‘দামু’ (Damu) শেষ পর্যন্ত সেরা শিশুচলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কারও এনে দেয়। আজ পরিচালক (Raja Sen) নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট সেই সরল মানুষটি যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, অসম্ভবের পথেও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলার নামই জীবন।
তবে রাজা সেনের (Raja Sen) পথচলা শুধু ‘দামু’-তে থেমে থাকেনি। দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি পরিচালনা করেছেন একাধিক ছবি, ধারাবাহিক এবং তথ্যচিত্র। তাঁর পরিচালিত ‘দেশ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন। বাংলা বিনোদন জগতের নানা পরিসরে নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গিয়েছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে ‘ভালবাসার গল্প’ ছিল তাঁর শেষ পরিচালিত ছবি। তারপর আর পরিচালক হিসেবে ক্যামেরার পিছনে ফেরা হয়নি তাঁর।
শেষ কয়েকটা দিন অবশ্য ছিল কঠিন লড়াইয়ের। কোমরে চোট নিয়ে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন রাজা সেন (Raja Sen)। ক্রমশ অবনতি হতে থাকে শারীরিক অবস্থার। ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়, আক্রান্ত হন হৃদরোগেও। গত সোমবার তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখা দেয় কিডনির সমস্যাও। শেষপর্যন্ত ভেন্টিলেশনে রাখা হলেও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
ব্যক্তিগত জীবনেও শেষ মুহূর্তে থেকে গেল এক গভীর বেদনা। রাজা সেনের বড় মেয়ে জার্মানিতে থাকেন। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে তাঁকে বিদেশে ফিরে যেতে হয়েছিল। ফলে এই মুহূর্তে দেশে ফেরা সম্ভব না হওয়ায় বাবার শেষযাত্রায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না তিনি।
জীবনে প্রতিকূলতা কম আসেনি। তবু কাজের মধ্যেই বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন রাজা সেন। ‘দামু’-র (Damu) মতো একটি ছবিতে তিনি যে বিশ্বাস, মায়া আর মানবিকতার গল্প বলেছিলেন, তাঁর নিজের জীবন ও কর্মযাত্রার দিকেও তাকালে সেই একই নিষ্ঠার ছাপ যেন দেখা যায়।
দামু একদিন একটি ছোট্ট মেয়েকে কথা দিয়েছিল সে তাকে হাতি দেখাবে। সেই কথা রাখার জন্য পাড়ি দিয়েছিল অজানা পথে। আজ রাজা সেন চলে গেলেন। থেকে গেল তাঁর (Raja Sen) সিনেমা, তাঁর গল্প, তাঁর চরিত্ররা। আর থেকে গেল এক পরিচালকের দেওয়া সেই অমূল্য প্রতিশ্রুতি, সরল, মানবিক বাংলা সিনেমাকে ভালোবেসে যাওয়ার।


