Aaj India Desk, কলকাতা: সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কুবেরের বিষয়আশয়’-এর নাম টেনে বীরভূমের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টায় বীরভূমে পুলিশি অভিযানে যে বিপুল পরিমাণ নগদ, সোনা এবং সম্পত্তির হদিস মিলেছে, তা যে কাউকেই বিস্মিত করবে।
শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্গমিত্রা ঘোষকে পাশে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বীরভূমের কথিত ‘পাথরসম্রাট’ টুলু মণ্ডল (Tulu Mondal) ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অভিযানে এখনও পর্যন্ত ১৫০ কোটিরও বেশি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে শুধু বীরভূমের পাথর শিল্প থেকেই প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব হারিয়েছে রাজ্য। এই ঘটনার জন্য তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) দায়ী করেন।
কী কী উদ্ধার হয়েছে?
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টুলু মণ্ডল এবং তাঁর শ্যালক মিনার মণ্ডলের বিরুদ্ধে অভিযানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, গয়না, গাড়ি এবং সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে।
নগদ ও গয়না: মিনার মণ্ডলের ডেরা থেকে প্রথম দফায় ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। পরে আরও ৫৩ লক্ষ টাকা নগদ, ২৬৮ গ্রাম সোনার গয়না, ৪০০ গ্রাম রূপোর সামগ্রী এবং ২৩ গ্রাম প্ল্যাটিনামের গয়নাও উদ্ধার হয়েছে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: তদন্তে টুলু মণ্ডলের নামে প্রায় ৯৩ কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্সের সন্ধান পাওয়া গেছে। সমস্ত সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ইতিমধ্যেই ফ্রিজ করা হয়েছে।
গাড়ি ও স্থাবর সম্পত্তি: অভিযানে বিএমডব্লিউ, অডি-সহ মোট ২৪২টি যানবাহন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৮৩টি ডাম্পার ও ট্রাক। এছাড়া ৩টি পাথর খনি, ২টি ক্রাশার, ২টি পেট্রোল পাম্প, একটি ফার্মহাউস, ৭টি বড় বাড়ি এবং প্রায় ৩০০ বিঘা জমি-সহ মোট ২১টি স্থাবর সম্পত্তি আইনি প্রক্রিয়ায় বাজেয়াপ্ত করার কাজ চলছে।
অন্যান্য সামগ্রী: তদন্তকারীরা ৩টি টাকা গোনার মেশিন, একটি কম্পিউটার, দুটি পেন ড্রাইভ এবং বিপুল পরিমাণ ভুয়ো ডিসিআর, রোড চালান ও চেকবই উদ্ধার করেছেন।
অভিযান সফলভাবে পরিচালনার জন্য বীরভূম জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার এবং রাজ্য পুলিশের ডিজিকে ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী।
‘১৫ বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি’
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, আগে বীরভূমের পাথর শিল্প থেকে বছরে মাত্র ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক মাসে সেই আয় বেড়ে ৮৩ কোটিতে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে তা প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি।
তাঁর অভিযোগ, সরকারি হিসাবে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা জমা পড়লেও প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে বাইরে চলে যেত। তাঁর মতে, গত ১৫ বছরে শুধু বীরভূম থেকেই প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব চুরি হয়েছে। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে এলে আরও হাসপাতাল, স্কুল এবং বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হতো।তিনি আরও জানান, পূর্ব বর্ধমানে বেআইনি ভাবে মজুত রাখা বালি নিলামে তুলে একবারেই প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ
এই ঘটনার প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এত বিপুল সম্পত্তি, শত শত বিলাসবহুল গাড়ি এবং বিস্তীর্ণ জমি প্রশাসনের একাধিক দপ্তরের সহযোগিতা ছাড়া গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, রেজিস্ট্রি অফিস, পরিবহণ দপ্তর, পঞ্চায়েত, ভূমি দপ্তর এবং খনিজ সংক্রান্ত বিভাগের একাংশের সহযোগিতা না থাকলে এমন চক্র দীর্ঘদিন চলতে পারত না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শীর্ষ স্তরের প্রশ্রয় থাকায় নিচুতলার অনেক আধিকারিক ব্যবস্থা নিতে পারেননি। সেই কারণেই এই ঘটনার দায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ওপর বর্তায় বলে তাঁর দাবি।
গ্রেফতার ও তদন্ত
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই মামলায় মিনার মণ্ডলকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া হিসাবরক্ষক পিনাকী দে, সহকারী হিসাবরক্ষক রাকিবুল ইসলাম, একটি পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার কাউসার-সহ মোট পাঁচজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এই অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য সিআইডি, এসটিএফ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
সবশেষে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, গত ১০-১১ সপ্তাহে রাজ্যের আয়কর ও রাজস্ব আদায় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। চলতি আর্থিক বছরের শেষে রাজস্ব সংগ্রহ অন্তত ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলেও তিনি আশাবাদী।


