SPECIAL FEATURE
একটা সময় বিকেল মানেই ছিল টিভির সামনে বসে পড়া। স্কুল ব্যাগটা এক কোণে ছুড়ে রেখে, হাতে দুধ-মুড়ির থালা নিয়ে অপেক্ষা কখন শুরু হবে টম অ্যান্ড জেরি, ছোটভীম কিংবা সিন-চ্যান। কারও কাছে কার্টুন ছিল বন্ধু, কারও কাছে ছিল দিনের সবচেয়ে আনন্দের সময়। সেই চরিত্রগুলো শুধু বিনোদন দিত না, তারা শিখিয়েছিল বন্ধুত্ব, সাহস, দুষ্টুমি আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ।
কিন্তু আজকের শিশুরা কি সেই শৈশব পাচ্ছে?
আজ আর বিকেলে টিভির সামনে বসার তাড়া নেই। তার বদলে হাতে স্মার্টফোন, সামনে অন্তহীন স্ক্রল, সারা দিনের ক্লান্তি শেষ আদুরে বাচ্চা কে মা যত্নের – আদরে খাইয়ে দিচ্ছে । বাচ্চা অনরগল ১৫ সেকেন্ড, ৩০ সেকেন্ড, ৪৫ সেকেন্ড— একটার পর একটা রিলস নিজের অজান্তেই খাবারের সাথেই খেয়ে নিচ্ছে। হাসির ভিডিও, মজার ক্লিপ, নাচ, প্র্যাঙ্ক, গেমিং সবকিছুই চোখের সামনে মুহূর্তে হাজির। অপেক্ষা নেই, ধৈর্য নেই, গল্পের শেষ পর্যন্ত থাকার প্রয়োজনও নেই।
একটি টম অ্যান্ড জেরির পর্ব দেখতে ১০ মিনিট সময় লাগে। ছোটভীমের একটি গল্প শেষ হতে ২০ মিনিট। কিন্তু আজকের শিশুরা কি আর ১০ মিনিট ধরে একটি গল্প অনুসরণ করার ধৈর্য রাখছে?
প্রশ্নটা অস্বস্তিকর হলেও বাস্তব।
শিশুদের বিনোদনের জগতে এখন সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী আর অন্য কোনো কার্টুন নয়, বরং “অ্যালগরিদম”। এমন এক অ্যালগরিদম, যা জানে কোন ভিডিওতে শিশু আরও পাঁচ সেকেন্ড বেশি তাকিয়ে থাকবে, কোন শব্দে সে হাসবে, কোন দৃশ্যে সে পরের ভিডিওতে স্ক্রল করবে না। ফলাফল? মস্তিষ্ক অভ্যস্ত হয়ে উঠছে দ্রুত উত্তেজনা আর দ্রুত আনন্দ পাওয়ার সংস্কৃতিতে।
আর সেখানেই হারছে গল্প।
কারণ একটি গল্প সময় চায়। চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে সময় লাগে। ডোরেমন, সিন-চ্যান কিংবা ছোটভীম শুধু চরিত্র ছিল না, তারা ছিল শৈশবের অংশ। কিন্তু রিলসের চরিত্রগুলোর বেশিরভাগকেই শিশু হয়তো পরের দিন আর মনে রাখে না।
টেলিভিশনের TRP কমেছে, এটা শুধু একটি ব্যবসায়িক পরিসংখ্যান নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটি সামাজিক পরিবর্তনের গল্প। আজ অনেক শিশুই পুরো টম অ্যান্ড জেরির একটি পর্ব না দেখে তার ২০ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ দেখেই সন্তুষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা গল্পের শুরু, মাঝখান কিংবা শেষ জানছে না, শুধু জানছে দ্রুত বিনোদন।
এই পরিবর্তনের দায় কি শুধুই প্রযুক্তির?
সম্ভবত না।অভিভাবকদের ব্যস্ত জীবন, একসঙ্গে বসে টিভি দেখার অভ্যাস হারিয়ে যাওয়া, পরিবারের মধ্যে কথোপকথন কমে যাওয়া সবকিছুই এর জন্য দায়ী। অনেক সময় শিশুকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের স্বস্তি কি ভবিষ্যতে বড় মূল্য চুকিয়ে আনবে না?
যে শিশু ১৫ সেকেন্ডের বেশি এক জায়গায় মনোযোগ রাখতে পারছে না, সে কি আগামী দিনে বই পড়বে? একটি সিনেমা দেখবে? একটি জটিল সমস্যা নিয়ে চিন্তা করবে?
এই প্রশ্নগুলো এখন শুধু শিক্ষাবিদদের নয়, প্রতিটি পরিবারের।
ছোটভীম, টম অ্যান্ড জেরি কিংবা সিন-চ্যান এখনও হারিয়ে যায়নি। তারা এখনও আছে, কিন্তু শিশুদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আর নেই। তাদের জায়গা দখল করছে অসংখ্য ক্ষণস্থায়ী ভিডিও, যাদের আয়ু কয়েক সেকেন্ড।
হয়তো প্রযুক্তিকে থামানো যাবে না। রিলসও বন্ধ হবে না। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়
আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা সবকিছু দ্রুত চায়, কিন্তু কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে শেখে না?
আর যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে হারিয়ে যাচ্ছে শুধু অ্যানিমেশন নয়, হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের এক টুকরো জাদুও।


