Aaj India Desk, কলকাতা: বিজেপি (BJP) সাংসদ সৌমিত্র খান (Saumitra Khan) বুধবার দাবি করেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)-এর ভিতরেই এখন বড়সড় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, দলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ক (MLA) এবং ২০ জন সাংসদ (MP) তৃণমূল ছাড়তে প্রস্তুত রয়েছেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনুমতি দিলেই তারা বিজেপিতে যোগ দেবেন বলেও দাবি করেন তিনি। সৌমিত্রর বক্তব্য, “বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একবার সিদ্ধান্ত নিলেই তৃণমূল রাজনৈতিক দল হিসেবে আর টিকতে পারবে না। অনেকেই এখন দল ছাড়ার জন্য প্রস্তুত।”
এদিন তিনি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। সৌমিত্র খান বলেন, “পাপ করলে তার শাস্তি পেতেই হবে। পাপীদের জেলে যেতে হয়।” পাশাপাশি ২০২১ সালের ঘটনাও তুলে এনে তিনি দাবি করেন, তখন বিজেপি কর্মীদের বাড়ি ভাঙা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “আজ তার বাড়ির সামনে বুলডোজার দাঁড়িয়ে আছে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের দ্রুত শাস্তি হওয়া উচিত।”
যদিও সৌমিত্র খানের এই সমস্ত দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় বলেন, বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। তাঁর দাবি, “দলের কোনও সাংসদ বা বিধায়ক দল ছাড়ছেন না এবং বিজেপির দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”
এদিকে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ ও চাপ বাড়ছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক কাউন্সিলরের পদত্যাগ, গ্রেফতার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সম্প্রতি বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা একটি বৈঠকে যোগ দেন। সেখানে আরও তিন তৃণমূল বিধায়কেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। উল্লেখ্য, কদিন আগেই তাঁকে লোকসভায় তৃণমূলের চিফ হুইপের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তারপরেই কেন্দ্রের তরফে তাঁকে Y+ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া শুরু হয়। অন্যদিকে, বিভিন্ন পৌরসভা থেকে প্রায় ১০০ জনের কাছাকাছি কাউন্সিলর ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন বলে খবর। এর ফলে একাধিক পুরবোর্ডে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আগামী বছরের পুরভোটের আগেই কয়েকটি পুরবোর্ড ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম পদত্যাগ করতে চেয়েছেন বলেও জোর জল্পনা ছড়িয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি ঘোষণা হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় কাউন্সিলরদের পদত্যাগ না করার আবেদন জানিয়েছেন বলেই সূত্রের খবর।এর মধ্যেই দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগে একাধিক কাউন্সিলর গ্রেফতার হয়েছে। গত সপ্তাহেই তিনজন কাউন্সিলরকে গ্রেফতার করা হয়।
উত্তর ২৪ পরগনা এবং সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলের একাধিক পৌরসভা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাউন্সিলরদের পদত্যাগে। ভাটপাড়া পৌরসভায় ৩৫ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৩০ জন পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে পৌরসভার চেয়ারপার্সন রেবা রাহাও রয়েছেন। পাশের হালিশহর পৌরসভায় ২৩ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ১৬ জন পদত্যাগ করেছেন। একইভাবে কাঞ্চরাপাড়া পৌরসভা থেকেও ১৪ জন কাউন্সিলর ইস্তফা দিয়েছেন। ভাটপাড়া পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান দেবজ্যোতি ঘোষ বলেন, তাঁর সামনে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, পৌরসভার কর্মীরা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না এবং তৃণমূল নেতৃত্ব থেকেও কোনও দিকনির্দেশ বা সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই দক্ষিণ দমদমের প্রভাবশালী তৃণমূল কাউন্সিলর সঞ্জয় দাসের মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। গত ২৩ মে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। সঞ্জয় দাস তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়াও দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে পুর নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত চলছে বলে জানা গিয়েছে। এই মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে রয়েছেন আরও কয়েকজন নেতা। ইতিমধ্যেই প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে ইডি গ্রেফতার করেছে বলে খবর।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিজেপি নেতা সৌমিত্র খানের এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ, দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে একসঙ্গে অন্তত ২০ জন সাংসদের দল ছাড়া প্রয়োজন হতে পারে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে মোট ৪২টি লোকসভা আসন রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ২৯টি, বিজেপি ১২টি এবং কংগ্রেস ১টি আসনে জয়ী হয়েছিল।


