Aaj India Desk, কলকাতা: পুজোর আগেই ফের কলকাতায় এলেন বাংলাদেশের লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। বৃহস্পতিবার মহাজাতি সদনে ‘শিকল ভাঙার গল্প’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। ‘লে রিদম’ নামে একটি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কবিতা, গান ও নাচের পাশাপাশি নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক রত্না দেবনাথ, অভয়ার মা, পিসি সরকার জুনিয়র এবং শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। এদিন রত্না দেবনাথকে ‘উমা সম্মান’ দেওয়া হয়।
দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর গত ১ অগাস্ট কলকাতায় এসেছিলেন তসলিমা। এবার দ্বিতীয়বার শহরে এসে কেমন লাগছে, তা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রথমবার কলকাতায় আসার অনুভূতি ছিল অনেক বেশি তীব্র। এবার অবশ্য কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে। তাঁর কথায়, যত বেশি কলকাতায় আসবেন, ততই এই শহরকে নিজের বলে মনে হবে।
আগামী দিনে আবার কলকাতায় আসবেন কি না, সেই প্রশ্নেও ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন লেখিকা। তিনি জানান, বইমেলায় আসার ইচ্ছে রয়েছে। শুধু কোনও অনুষ্ঠান নয়, নিজের ইচ্ছেতেও কলকাতায় ঘুরতে আসতে চান তিনি। তাঁর কথায়, যখন ইচ্ছে হবে, তখনই আসবেন।
কলকাতায় এসে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের মানুষজনকে খুঁজে পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নেরও সরস জবাব দেন তসলিমা। তিনি বলেন, “ব্রহ্মপুত্রের দরকার কী। পদ্মা, সুরমা, গঙ্গা, যমুনার নয় কেন?”
এবার পাঁচ দিন কলকাতায় থাকবেন বলে জানান তসলিমা। বইমেলার সময় প্রায় এক মাস শহরে থাকার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি কোলাঘাটে গিয়ে ইলিশ খাওয়ার ইচ্ছের কথাও জানিয়েছেন।
তাঁকে নিয়ে অতীতের বিতর্কের প্রসঙ্গও এদিন উঠে আসে। এক সরকার তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, পরের সরকার তাঁকে বাংলাদেশে ফিরতে দেয়নি—এই প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, “এক সরকার তাড়িয়েছে, এক সরকার আসতে দেয়নি আর একটা সরকার নিয়ে এল। বিস্তর পার্থক্য।” তাঁর বিরুদ্ধে এখনও অনেকের ক্ষোভ রয়েছে বলেও জানান তিনি। তসলিমার কথায়, “মাঝে মাঝে মনে হয় যখন চারদিকে দেখি আমাকে কাদা ছুড়ছে, মারতে চাইছে। কিছু মানুষ তো ভালোবাসেন। অনেকে মেরে ফেলতে চায়। অনেকে ঘৃণা ছুড়ে দেয়।”
ভারত তাঁকে কলকাতায় আসার সুযোগ দিলেও বাংলাদেশে এখনও কেন ফিরতে পারছেন না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তসলিমা বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। তাঁর দাবি, ভারতে থেকে তিনি নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন, কিন্তু বাংলাদেশে যাওয়া এখনও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাও জেহাদি গোষ্ঠীর ভয়কে গুরুত্ব দিয়ে চলে। তাই জীবিত অবস্থায় তাঁর বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব হবে না বলেই মনে করেন তিনি।
নিজের দেহদানের সিদ্ধান্তের কথাও জানান লেখিকা। তিনি বলেন, তাঁর দেহ এমস-এ দান করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে নিউইয়র্কের যে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হবে, সেখানেই দেহদানের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকার ইচ্ছের কথাও প্রকাশ করেছেন তসলিমা। তিনি জানান, সরকার অনুমতি দিলে দিল্লিতে থাকার পর্ব শেষ করে কলকাতায় চলে আসতে চান। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগে বলেছিলেন, তসলিমা যখন ইচ্ছে কলকাতায় আসতে পারেন এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার নেবে। এ প্রসঙ্গে তসলিমা জানান, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কথা হয়নি। তবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে যদি তাঁকে কলকাতায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন বলেও জানান।
‘শিকল ভাঙার গল্প’ অনুষ্ঠানের নাম নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তসলিমা। তাঁর বক্তব্য, অনুষ্ঠানের নাম বদলাতে পারে, কিন্তু তিনি নিজের জায়গায় একই রয়েছেন। তাঁর লেখার বিষয়ও একই। নারীর অধিকার এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আগের মতোই রয়েছে।
আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চ শিক্ষা দফতরের অধীনে আনার প্রসঙ্গেও প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ এতে আপত্তি করছে, তা তাঁর জানা নেই বলে জানান তসলিমা। তবে ধর্মান্ধতার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তাঁর মত। তাঁর মতে, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতোই স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত।
মাদ্রাসা নিয়েও সরব হন তসলিমা। বাংলাদেশে অনেক মাদ্রাসা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, সেখানে জঙ্গি তৈরির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, শুধু কোরাণ-হাদিস পড়ে একজন মানুষের জীবন ও সমাজের কতটা উন্নতি হতে পারে? ছাত্রছাত্রীদের মগজধোলাই করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জঙ্গি ও জেহাদি তৈরির পথ বন্ধ করতে মাদ্রাসা ব্যবস্থা বন্ধ করার পক্ষেও মত দেন তসলিমা। পাশাপাশি তিনি জানান, পরকালে তাঁর বিশ্বাস নেই।


