29 C
Kolkata
Saturday, September 5, 2026
spot_img

সরকার ব্যস্ত শিক্ষক দিবস উদযাপনে, যোগ্য শিক্ষক আজ ঘরে! অযোগ্যদের ভিড়ে হারিয়ে গেল মেধার সম্মান?

Aaj lndia Desk, কলকাতা: ৫ সেপ্টেম্বর। শিক্ষক দিবস। স্কুলে স্কুলে আজ শিক্ষকদের নিয়ে অনুষ্ঠান, সংবর্ধনা, শুভেচ্ছা। অথচ বাংলারই একদল শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে দিনটা উৎসবের নয়, বরং পুরনো ক্ষত আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়ার দিন। কারও হাতে একসময় ছিল চক-ডাস্টার, ক্লাসরুমে ছিল ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। আজ সেই মানুষগুলির অনেকেই চাকরি হারিয়ে ঘরে। কেউ আদালতে, কেউ আন্দোলনের মঞ্চে, কেউ আবার নতুন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। সবচেয়ে যন্ত্রণার জায়গা এখানেই দুর্নীতির অভিযোগ ছিল নিয়োগ ব্যবস্থায়, কিন্তু তার অভিঘাত এসে পড়ল যোগ্যদের জীবনেও,তাই অনেকেই আজ প্রশ্ন তুলছে …..

২৫,৭৫৩ চাকরি বাতিল, যোগ্যদের প্রশ্ন আমাদের অপরাধ কোথায়?

২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের তালিকা ছিল দীর্ঘ। মেধাতালিকায় কারচুপি, OMR-এ অনিয়ম, নম্বর বদল, মেধাতালিকায় পিছিয়ে থাকা প্রার্থীর চাকরি পাওয়া একাধিক অভিযোগ আদালতে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্ট গোটা ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে। পরে সুপ্রিম কোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। মোট ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর নিয়োগ বাতিল হয়।

কিন্তু এই সংখ্যার ভিতরেই রয়েছে সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট। প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষককে ‘যোগ্য’ বা untainted হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তাঁদের ভবিষ্যৎও একসময় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের চাকরির মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ৩১ মে ২০২৭ পর্যন্ত করেছে। একইসঙ্গে স্পষ্ট করেছে, এটিই শেষ সময়সীমা; তার মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। অর্থাৎ আজ শিক্ষক দিবসে স্কুলে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক শিক্ষকও জানেন তাঁদের চাকরির নিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি, কিন্তু সেটি চিরস্থায়ীও নয়।

মৃত্যুর মিছিল, ভেঙে পড়া পরিবার

এই নিয়োগ-সংকট যে শুধু চাকরির কাগজে আটকে নেই, তার ভয়াবহ ছবি মিলেছে একাধিক ঘটনায়।

২০২২ সালে নন্দীগ্রামের শিক্ষক তুম্পারানি মণ্ডল পারুয়া আত্মহত্যা করেন। তাঁর নাম নিয়োগ-সংক্রান্ত তদন্তের তালিকায় রয়েছে এমন একটি তালিকা ছড়িয়ে পড়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছিল।

এরপর ২০২৫ সালে চাকরিহারা শিক্ষক প্রবীণ কর্মকারের মৃত্যু হয়। পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্যে উঠে আসে চাকরি হারানো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র উদ্বেগের কথা।

একই বছর চাকরিহারা শিক্ষক আন্দোলনের অন্যতম মুখ সুবল সোরেন ব্রেন স্ট্রোকে মারা যান। তাঁর পরিবার জানিয়েছিল, চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে নিয়োগ-দুর্নীতির ছায়া সামনে এনেছে। তাঁর নাম আগে নিয়োগ-সংক্রান্ত বাতিল তালিকায় ছিল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুর একমাত্র কারণ নিয়োগ-দুর্নীতি এমন কোনও চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত এখনও নেই।

অর্থাৎ অন্তত চারটি মৃত্যুর ঘটনায় নিয়োগ-সংকটের চাপ বা যোগসূত্র নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সবকটিকে সরাসরি ‘দুর্নীতির কারণে মৃত্যু’ বলে চূড়ান্তভাবে দাবি করার মতো সরকারি প্রমাণ নেই।

নতুন পরীক্ষা হয়েছে, নিয়োগও এগিয়েছে তবু যোগ্যদের ক্ষত সারল কি?

সরকার ও কমিশন অবশ্য নতুন নিয়োগের পথে এগিয়েছে। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় SLST-এর মাধ্যমে ৩৫,৭২৬টি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নবম-দশম শ্রেণির পরীক্ষা হয় ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, আর একাদশ-দ্বাদশের পরীক্ষা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। প্রাথমিক স্তরেও ১৩,৪২১টি শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অর্থাৎ নতুন করে নিয়োগের দরজা খোলার চেষ্টা হয়েছে ঠিকই।

কিন্তু এখানেই ক্ষোভটা আরও গভীর। যাঁরা বছরের পর বছর চাকরি করেছেন, তাঁরা বলছেন নতুন পরীক্ষায় বসে আবার নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে কেন?

প্রশ্নটা আরও কঠিন। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন, সেই ব্যবস্থার অনিয়মের দায় যদি প্রশাসনিক স্তরে থেকে থাকে, তার পুরো মূল্য কেন একজন প্রকৃত যোগ্য শিক্ষক দেবেন?

সরকারের তরফে স্বচ্ছতা ফেরানোর জন্য OMR প্রকাশ, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যোগ্য চাকরিহারাদের স্থায়ী সমাধান এখনও আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে। কমিশনের ওয়েবসাইটেও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

তাই আজ শিক্ষক দিবসে আসল প্রশ্নটা ফুল-মালা নিয়ে নয়। যে শিক্ষক যোগ্য হয়েও সমাজের চোখে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত নিয়োগের অংশ’ হয়ে যাওয়ার অপমান বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁর সম্মান ফিরবে কীভাবে?

যাঁরা মাথা উঁচু করে স্কুলে যেতে চান, তাঁদের হাতে শুধু নতুন পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড নয় দরকার ন্যায়ের নিশ্চয়তা। কারণ অযোগ্যকে সরানো ন্যায়বিচার, কিন্তু যোগ্যকে হারিয়ে ফেলা আরও এক অন্যায়।

আজ সরকার শিক্ষক দিবস পালন করুক। কিন্তু সেই মঞ্চের আলো যেন অন্তত একবার পৌঁছয় সেই বাড়িগুলিতেও, যেখানে একজন যোগ্য শিক্ষক এখনও অপেক্ষা করছেন“কবে আবার আমার ক্লাসরুমে ফিরব?”

রং পাল্টাচ্ছে, দল পাল্টাচ্ছে, কিন্তু বদলাচ্ছে কি নিয়োগের সেই সিস্টেম? বারবার নতুন পরীক্ষা দিয়ে কি শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে যোগ্য শিক্ষকদেরই? আর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাঁদের ভবিষ্যৎ কী পুনর্নিয়োগ, নাকি ফের অপেক্ষা? এই প্রশ্নের উত্তর কি আদৌ দেবে সরকার?

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন