SPECIAL FEATURE
খাওয়া শেষ। পেটও ভরে গেছে। কিন্তু খাবারের শেষে যদি সামনে এক টুকরো চকলেট, এক টুকরো কেক বা একটি রসগোল্লা রাখা হয়, অনেকেই না বলতে পারেন না। এমন অভিজ্ঞতা খুবই সাধারণ। প্রশ্ন হলো, শরীরের আর খাবারের প্রয়োজন না থাকলেও কেন মিষ্টি খাওয়ার এত প্রবল ইচ্ছে হয়?
জানেন বিশেষজ্ঞরা কি বলছে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্ক এবং হরমোনে। অর্থাৎ, এটি শুধু অভ্যাস নয়, বরং শরীরের জটিল জৈবিক প্রক্রিয়ার ফল। গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশ স্বাদ ও খাবারের স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আগে কোনো মিষ্টি খাবার খেয়ে আনন্দ পেলে সেই অভিজ্ঞতা মস্তিষ্ক মনে রাখে। পরে একই ধরনের খাবার চোখে পড়লে বা তার কথা মনে এলেই সেই সুখকর অনুভূতি আবার ফিরে পেতে মন চায়।
এখানেই শেষ নয়। মিষ্টি বা চর্বিযুক্ত খাবার খেলে শরীরে ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এটি আমাদের আনন্দ দেয়। ফলে পেট ভরা থাকলেও মস্তিষ্ক আবার সেই আনন্দ ফিরে পেতে মিষ্টি খেতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে, সেরোটোনিন-এর ভারসাম্য কমে গেলে মন খারাপ, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ বাড়তে পারে। তখন অনেকেই অজান্তেই মিষ্টির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন।
বিজ্ঞানীরা আরও মনে করেন, এই প্রবণতার শিকড় আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত। হাজার হাজার বছর আগে যখন নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না, তখন ফল, মধু বা অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় উচ্চ-ক্যালরির খাবার পেলে মানুষ বেশি করে খেত। কারণ, সেই অতিরিক্ত শক্তি ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় কাজে লাগত। বিবর্তনের ধারায় সেই প্রবণতার কিছু অংশ আজও আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কে রয়ে গেছে।
এ ছাড়াও রক্তে শর্করার ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। এরপর ইনসুলিনের প্রভাবে সেই মাত্রা কমতে শুরু করলে অনেক সময় শরীর আবার মিষ্টি খাওয়ার সংকেত দেয়। একই সঙ্গে ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী ঘ্রেলিন ও লেপ্টিন হরমোনের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে, যা কখনও কখনও প্রকৃত ক্ষুধা না থাকলেও মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ না করলে দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ফলে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং দাঁতের ক্ষয়ের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মিষ্টি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিমাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। মিষ্টির বদলে তাজা ফল খাওয়া ভালো বিকল্প হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখলেও মিষ্টির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। খাওয়ার সময় সচেতনভাবে নিজের ক্ষুধা ও অভ্যাসের পার্থক্য বোঝার চর্চাও উপকারী।
মিষ্টি ভালো লাগা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। তবে সেই ইচ্ছা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই স্বাদ উপভোগ করুন, কিন্তু সংযম বজায় রাখুন সুস্থ থাকার এটাই অন্যতম সহজ উপায়।


