Aaj lndia Desk,কাঠমান্ডু : প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত নেপালে পরিস্থিতির এখনও কোনও উন্নতি নেই। হিমবাহ ভেঙে নেমে আসা জল ও তার জেরে তৈরি হওয়া প্রবল হড়পা বান একাধিক এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে । উদ্ধার অভিযান চললেও প্রতিদিনই সামনে আসছে নতুন করে মৃত্যুর খবর। নেপাল সরকারের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ১,২৫৯টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৯৫ জনের। এখনও ৫,০৮৩ জন নিখোঁজ বলে সরকারি হিসেবে জানানো হয়েছে।
কোন এলাকায় কত মৃত্যু?
দুর্যোগের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে চিতোয়ান জেলায়। সেখানে উদ্ধার হয়েছে ৩৫৫টি মৃতদেহ। নওয়ালপারসি পূর্ব ও পশ্চিমে যথাক্রমে ২১৮ এবং ২১২টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। নুয়াকোটে মৃতের সংখ্যা ১৭৭, রাসুয়ায় ১২৭। এছাড়া গোর্খায় ৭২, ধাদিঙে ৬০ এবং তানাহুনে ৩৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীরা এখনও বিভিন্ন জায়গায় দেহাংশ খুঁজে পাচ্ছেন, যার অনেকগুলিই শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শুধু মৃত্যুই নয়, মিলেছে জীবনের সন্ধানও। এখনও পর্যন্ত ১২,০৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। পাঁচ হাজারের বেশি আহত ও অসুস্থ মানুষ বিভিন্ন হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২১ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধার ও ত্রাণকাজে যুক্ত রয়েছেন। ঘরছাড়া মানুষদের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয়েছে ৩,৮৪৪টি ত্রাণশিবির। বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ ফেরাতে সেতু ও যোগাযোগ টাওয়ার নির্মাণের কাজও চলছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জে অভিযোগ জানাবে নেপাল
এই বিপর্যয়ের পিছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশ্ন তুলেছে নেপাল। নেপাল সরকারের অভিযোগ, ভারত, আমেরিকা ও চিনের দূষণের প্রভাব হিমালয়ের পরিবেশের উপর পড়ছে। এই কারণে ক্ষতিপূরণ চেয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে তারা। ৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। সেখানে নেপালের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। সরকার গঠনের পর এটাই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর।
উদ্ধারকাজে ভারতের বড় ভূমিকা
২৬ আগস্ট রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে আচমকা জল, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত নেমে আসে। নিমেষে ভেসে যায় একাধিক নিম্নাঞ্চল। বিপর্যয়ের পর বেশ কয়েকজন ভারতীয় পর্যটকেরও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রাথমিকভাবে বিদেশি সাহায্য নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি থাকলেও পরে নেপাল ভারতকে উদ্ধার ও সহায়তা অভিযানে যুক্ত হওয়ার অনুমতি দেয়। বৃহস্পতিবার ভারতীয় বায়ুসেনার দুটি C-130J বিমান নেপালের উদ্দেশে রওনা দেয়। বিমানে ছিল ওষুধ, ফরেন্সিক সরঞ্জাম এবং ২১ জন বিশেষজ্ঞ। এখনও পর্যন্ত ভারতের তরফে ৬৮ টনেরও বেশি ত্রাণসামগ্রী নেপালে পৌঁছেছে।
সতর্কবার্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
দুর্যোগের আগে পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকা সত্ত্বেও কেন সাধারণ মানুষকে দ্রুত সতর্ক করা গেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ রাসুয়ার লেন্দে উপত্যকায় হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ে। কিন্তু বিপদসংকেত মানুষের কাছে পৌঁছয় প্রায় ৩৮ মিনিট পরে, সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে। এর মধ্যেই সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে স্যাব্রুবেসীর নদীর জল মাপার যন্ত্র জলের তোড়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
তিব্বতের ভূমিকম্পে ফের আতঙ্ক
এই ভয়াবহতার মধ্যেই বৃহস্পতিবার তিব্বতে নতুন করে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৪ কিলোমিটার নীচে। প্রায় ১১৬ কিলোমিটার দূরের জোশীমঠেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে অস্থায়ী জলাধারে বিপুল পরিমাণ জল জমে থাকায় ভবিষ্যতে ফের হড়পা বান বা ধস নামার আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিলেন চিনের বিজ্ঞানীরা। নতুন ভূমিকম্পের পর সেই আশঙ্কাই আরও জোরালো হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত নতুন কম্পনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।


