Aaj India Desk, কলকাতা : রাজ্যে ভোটের পর থেকেই যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অসন্তোষ, দলত্যাগের জল্পনা এবং ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এই নিয়ে গতকালই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একটি কবিতার মাধ্যমে সরব হয়েছিলেন। এবার একই পথ অনুসরণ করলেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষও (Kunal Ghosh)। বৃহস্পতিবার সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ স্তাবকতা, সুবিধাবাদ এবং ‘ফ্যান ক্লাব’ সংস্কৃতির সমালোচনা করলেন। একইসঙ্গে, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর যাঁরা আচমকা দলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, তাঁদেরও কটাক্ষ করলেন তিনি।
দলের ‘বিপ্লবী’দের কি বললেন কুনাল ?
বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি পোস্টের মাধ্যমে কুণাল (Kunal Ghosh) বলেন, যাঁরা কয়েক সপ্তাহ আগেও এই দলকেই সমর্থন করে ভোটে লড়েছেন বা টিকিট চেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখন দলের ভুলত্রুটি নিয়ে সরব হচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন, “দল যদি এত খারাপ, প্রার্থী হলেন কেন?” তিনি দাবি করেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন অনেকেই মন্ত্রীত্ব বা পদ পাওয়ার আশায় নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তোষামোদি করার বা ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতেই তাঁদের বক্তব্যের সুর বদলে গিয়েছে। তাঁরাই আজ প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন, দলের সমালোচনা করছেন, আবার কেউ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন। এই নেতাদের নিয়ে পোস্টে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কুনাল। দলের এই নেতার আচরণ নিয়ে তিনি স্পষ্ট বলেন, “দল ক্ষমতায় থাকলে আমরা আছি, আর ক্ষমতায় না থাকলেই এত লোকের একসঙ্গে শ্বাসকষ্ট, এটা দৃষ্টিকটূ।”
কুণাল ঘোষের পোস্ট : https://x.com/i/status/2059878533904916850
‘ধান্দাবাজ’ মানুষদের গুরুত্ব ?
দলের সাংগঠনিক পরিবেশ নিয়েও সরব হয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক। তাঁর অভিযোগ, দলে এক শ্রেণির স্তাবক, সুবিধাবাদী ও ‘ধান্দাবাজ’ মানুষ অতিরিক্ত গুরুত্ব পেয়েছেন। এর ফলে সংগঠনের ভেতরে “নেতার ফ্যান ক্লাব” এবং “সচিবের ফ্যান ক্লাব” সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে কুণাল জানান, অতীতে দলের ভুলত্রুটি নিয়ে মুখ খোলায় তাঁকে একাধিকবার সাসপেন্ড এবং সেন্সরড হতে হয়েছে। তাঁর দাবি, তখন বর্তমানের অনেক ‘বিপ্লবী’ নেতাকর্মী নীরব ছিলেন। তিনি লেখেন, “বিনা দোষে আমার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা এই দলে কেউ পায়নি।” সেই কারণেই দলের উপর ক্ষোভ বা অভিমান করার অধিকার তাঁরও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পরামর্শ
তবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) সহকর্মীদের তিনটি মূল পরামর্শ দিয়েছেন।
- প্রথমত, আক্রান্ত ও চাপে থাকা দলীয় কর্মীদের পাশে সশরীরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
- দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও জনসংযোগ কর্মসূচি দ্রুত পুনরায় শুরু করার কথা বলেছেন। পাশাপাশি কেন্দ্র ও রাজ্যের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলারও বার্তা দিয়েছেন।
- তৃতীয়ত, দলের ভেতরের ভুলত্রুটি নিয়ে প্রকাশ্যে নয়, সাংগঠনিক স্তরে খোলামেলা আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই দলকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করা উচিত।
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে তৃণমূলের অন্দরের অসন্তোষ যখন ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে, তখন কুণাল ঘোষের এই খোলা চিঠি দলীয় অন্দরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তিনি নেতৃত্বের ভুলত্রুটি ও স্তাবকতার সংস্কৃতির সমালোচনা করলেও দলের সংগঠনকে পুনর্গঠনের বার্তা দিয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলের মতে, এই চিঠি শুধু ক্ষোভ প্রকাশ নয়, ভবিষ্যতে তৃণমূলকে রাজনীতির ময়দানে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস। তবে এই রাজনৈতিক আবহে যেখানে দলের বেশিরভাগ নেতাই দল ছাড়ার চেষ্টা করছে, সেখানে এই প্রয়াস কতটুকু কার্যকর হয় সেটাই এবার দেখার।


