Aaj India Desk, কলকাতা: বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে আরও গোছানো ও নিয়মের মধ্যে আনতে নতুন ‘West Bengal Film & Shooting Policy’ তৈরির পথে রাজ্য সরকার। টেকনিশিয়ানদের বেতন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শুটিংয়ের অনুমতি থেকে শুরু করে বাংলা ছবির বাজার বাড়ানো—একাধিক বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই নিয়ে ১৮ দফার একটি রোডম্যাপ সামনে এসেছে।
১৮ দফায় কী কী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে?
১. ফেডারেশন পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ
ফেডারেশন অফিস দ্রুত ফের চালুর দাবিটি খতিয়ে দেখবে রাজ্য। প্রযোজক, গিল্ড এবং সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি Working Committee গঠনের প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে।
২. টেকনিশিয়ানদের বেতন সুরক্ষা
টেকনিশিয়ানদের টাকা আটকে রাখা বা নির্ধারিত টাকার চেয়ে কম দেওয়ার অভিযোগে নজর রাখা হবে। বারবার বেতন আটকে দেওয়া লাইন প্রোডিউসারদের গিল্ড চিহ্নিত করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রযোজককে ভবিষ্যতে কাজের ক্ষেত্রে ব্ল্যাকলিস্ট করার প্রস্তাবে প্রযোজক ও গিল্ড—দুই পক্ষই সহমত।
৩. প্রযোজকদের জন্য SOP
প্রোডাকশন পরিচালনা ও পেশাগত আচরণের ক্ষেত্রে প্রযোজকদের জন্য Standard Operating Procedure বা SOP তৈরি হবে। সময়মতো বেতন, আচরণবিধি, হয়রানি রোধ, খাবারের ব্যবস্থা, রাতের শুটিং শেষে যাতায়াত এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মতো বিষয় এতে থাকবে।
৪. টেকনিশিয়ানদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা
রাতে শুটিং শেষ হলে বাড়ি ফেরার পরিবহণ, নির্দিষ্ট সময়ে লাঞ্চ ও ডিনার, নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ এবং শুটিং ফ্লোরে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
৫. প্রযোজক ও গিল্ডের মধ্যে MoU
প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযোজক ও গিল্ডের দায়িত্ব-কর্তব্য স্পষ্ট করতে দুই পক্ষের সম্মতিতে Memorandum of Understanding বা MoU করা যেতে পারে।
৬. বাংলা ছবির প্রদর্শন বাড়ানো
ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে প্রায় ৩০-৪০টি হলে ছবি দেখাতে প্রযোজকদের প্রায় ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচের বিষয়টি বৈঠকে উঠে এসেছে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকারি অডিটোরিয়াম ও প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিত বাংলা ছবি দেখানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে রাজ্য।
৭. স্টুডিও ভাড়ায় স্বচ্ছতা
স্টুডিও ভাড়া এবং ভাড়ার কাঠামো আরও স্বচ্ছ ও যুক্তিসঙ্গত করতে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবে।
৮. ডিজিটাল চার্জে নিয়ন্ত্রণ
ডিজিটাইজেশন ও ডিজিটাল চার্জের খরচ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলাদা আলোচনা হবে। প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরির সুপারিশ করা হবে।
৯. রাজ্যের নিজস্ব Film & Shooting Policy
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই পূর্ণাঙ্গ ‘West Bengal Film & Shooting Policy’ তৈরি করা হবে।
১০. শুটিংয়ের অনুমতিতে Single Window ব্যবস্থা
শুটিংয়ের জন্য বিভিন্ন সরকারি দফতরের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে Single Window Clearance System তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই কাজে কেন্দ্রের WAVES এবং রাজ্যের Shilpa Sathi প্ল্যাটফর্মকেও ব্যবহার করার ভাবনা রয়েছে।
১১. টলিউডে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স
টেকনিশিয়ানদের Digital Manpower Database তৈরি, অনলাইন গিল্ড পরিষেবা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং গিল্ড সদস্যপদ-সহ বিভিন্ন পরিষেবার জন্য মোবাইল অ্যাপ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।
১২. অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা
কোনও সমস্যা বড় আকার নেওয়ার আগেই ফেডারেশন ও সংশ্লিষ্ট গিল্ডের মাধ্যমে তা মেটাতে Grievance Redressal Mechanism তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
১৩. বাংলা ছবির বাজার বাড়ানো
রাজ্যের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অংশ এবং বিদেশের বাজারেও বাংলা ছবির পরিসর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনা করবে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
১৪. তরুণ ও স্বাধীন পরিচালকদের সহায়তা
Young ও Independent Filmmakers-দের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং প্রোডাকশন পরিকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৫. স্বাস্থ্যবিমা ও PF-এর সম্ভাবনা
টেকনিশিয়ানদের Ayushman Bharat বা অন্য কোনও সরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা যায় কি না, তা সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে দেখা হবে। পাশাপাশি শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের Provident Fund বা PF-এর আওতায় আনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
১৬. টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ
নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে টেকনিশিয়ানদের Training, Re-skilling এবং Up-skilling-এর ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফিল্ম ও ডিজিটাল কনটেন্টের পরিবর্তিত প্রযুক্তিতে তাঁদের দক্ষতা বাড়ানো হবে।
১৭. গিল্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে FIR
কয়েকজন গিল্ড সদস্যের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR প্রত্যাহারের আবেদন এসেছে। আইন মেনে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য আবেদনটি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
১৮. পৃথক Producers’ Association
প্রযোজকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, নিয়মিত আলোচনা এবং ইন্ডাস্ট্রি সংক্রান্ত বিষয়ে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্যে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক Producers’ Association তৈরির প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, টেকনিশিয়ানদের অধিকার থেকে শুরু করে শুটিংয়ের অনুমতি, প্রযোজকদের দায়িত্ব, বাংলা ছবির প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক বাজার—ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেই এই ১৮ দফার পরিকল্পনার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা তিন মাস পর ফের পর্যালোচনা করবে রাজ্য সরকার। প্রয়োজন হলে সেই অনুযায়ী নিয়মে পরিবর্তনও আনা হতে পারে।


