33 C
Kolkata
Tuesday, April 21, 2026
spot_img

২৫ হাজার ঘণ্টা রিলসে উড়ে যাচ্ছে? জানেন কী হারাচ্ছেন?

SPECIAL FEATURE 

ভারতবর্ষে গড়ে একজন কিশোর (Teenager) দিনে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা রিলস (Reels) দেখে। শুনতে হয়তো খুব সাধারণ লাগে, কিন্তু একটু থেমে ভাবুন-একটা দিনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় কেটে যাচ্ছে একটি ছোট্ট স্ক্রিনের (Screen) সামনে।

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়টা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আঙুলের একটানা স্ক্রলের মধ্যে।যদি কোনও ছেলে বা মেয়ে ১৫ বছর বয়স থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত এই অভ্যাস ধরে রাখে, তাহলে আগামী ১০ বছরে সে প্রায় ২৫ হাজার ঘণ্টা রিলস (Reels) দেখে ফেলবে। ২৫ হাজার ঘণ্টা-যে সময়ে কেউ ডাক্তার হতে পারে, কেউ বিজ্ঞানী হতে পারে, কেউ নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে পারে, কেউ পৃথিবী বদলে দেওয়ার মতো কিছু শিখে ফেলতে পারে। অথচ সেই সময়টাই খরচ হয়ে যাচ্ছে কিছু সেকেন্ডের ভিডিও দেখে, যা দেখার কয়েক মিনিট পরেই মনে থাকে না।

আমরা এটাকে বলি “টাইম পাস”। কিন্তু সত্যিটা অনেক কঠিন। এটা শুধু সময় নষ্ট নয়, এটা ধীরে ধীরে একটা মানুষকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার এক নিঃশব্দ প্রক্রিয়া। আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন, রিলস (Reels) দেখতে বসে মনে হয়েছে মাত্র ১০ মিনিট হয়েছে, অথচ ঘড়ি বলছে দুই ঘণ্টা কেটে গেছে? এটা আপনার দুর্বলতা নয়। এটা আপনার অলসতা নয়। এটা পরিকল্পিত।

আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন (Dopamine) নামে একটি রাসায়নিক আছে। যখন আমরা নতুন কিছু দেখি, আনন্দ পাই, হঠাৎ চমক পাই-তখন এই ডোপামিন বের হয়। এই অনুভূতিটাই মানুষকে নতুন কিছু শেখায়, এগিয়ে নিয়ে যায়, বাঁচতে শেখায়। আর যখন আমরা রিলস দেখি তখন মনে হয়, আর একটা দেখি, আর জাস্ট একটা… তারপর বন্ধ করব।

কিন্তু আজকের সোশ্যাল মিডিয়া সেই মানবিক ব্যবস্থাটাকেই ব্যবসায় পরিণত করেছে। তারা জানে কীভাবে আপনার মনোযোগ আটকে রাখতে হয়, কীভাবে আপনাকে বারবার ফিরিয়ে আনতে হয়, কীভাবে আপনার সময়কে তাদের লাভে বদলে দিতে হয়।

একটা ভিডিও ভালো লাগল, পরেরটা হয়তো আরও ভালো হবে-এই আশাতেই আপনি স্ক্রল করেন। পরেরটা খারাপ হলে ভাবেন, আরেকটা দেখি। আবার হঠাৎ একটা অসাধারণ ভিডিও এলে মনে হয়, থাক, আর পাঁচ মিনিট দেখি। এভাবেই পাঁচ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, এক ঘণ্টা থেকে মাঝরাত।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই দ্রুত আনন্দের অভ্যাস বাস্তব জীবনের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। আপনি কি খেয়াল করেছেন? এখন আর আমাদের বই পড়তে ভালো লাগে না। ক্লাসে মন বসে না। পরিবারের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করে না। বন্ধুর পাশে বসেও ফোন হাতে নিতে ইচ্ছে করে। কারণ কি জানেন-বাস্তব জীবন ধীরে চলে, কিন্তু রিলস চলে প্রতি কয়েক সেকেন্ডে নতুন উত্তেজনা নিয়ে।

আজকের বহু কিশোর-কিশোরী তাই ধৈর্য হারাচ্ছে, মনোযোগ হারাচ্ছে, নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষমতা হারাচ্ছে। তারা সবসময় নতুন কিছু দেখতে চায়, নতুন কিছু শুনতে চায়, নতুন কিছু পেতে চায়। নীরবতা তাদের অস্বস্তি দেয়। একা থাকা কষ্ট দেয়। চিন্তা করা ক্লান্ত করে।

ভারতের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর। কারণ সস্তা ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন এখন প্রায় সবার হাতে। গ্রাম হোক বা শহর, গরিব হোক বা ধনী-একই ছবি দেখা যায়। মাথা নিচু, চোখ স্ক্রিনে, পাশে কে বসে আছে তা দেখারও সময় নেই। একটা সময় পরিবারে সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করত। এখনও সবাই একসঙ্গে বসে ঠিকই, কিন্তু আলাদা আলাদা পৃথিবীতে হারিয়ে থাকে।

আরও বড় ক্ষতি হচ্ছে মনের ভেতরে। মানুষ অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনকে অপূর্ণ মনে করতে শুরু করেছে। কেউ ঘুরতে গেছে, কেউ দামি জিনিস কিনেছে, কেউ হাসছে, কেউ সফল-এসব দেখে মনে হয়, সবাই ভালো আছে, শুধু আমি নই। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি পিছিয়ে।

এই তুলনা করাটাই মানুষকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়। আত্মবিশ্বাস কমে যায়। মন খারাপ বাড়ে। নিজের জীবনকেই ছোট মনে হয়।

তারপরও মানুষ ফোন নামাতে পারে না। কারণ রিলস শুধু আনন্দ দেয় না, নির্ভরতাও তৈরি করে। কয়েক মিনিট না দেখলেই অস্থির লাগে। ফোন পাশে না থাকলে ফাঁকা লাগে। মনে হয় কিছু একটা মিস হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো-আমরা অন্যের জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবনটাই বাঁচতে ভুলে যাচ্ছি।

একটা ছেলে হয়তো গিটার শিখতে পারত, কিন্তু সে স্ক্রল করছে। একটা মেয়ে হয়তো ছবি আঁকতে পারত, কিন্তু সে স্ক্রল করছে। কেউ বই লিখতে পারত, কেউ খেলোয়াড় হতে পারত, কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে আরও কিছু সময় কাটাতে পারত-কিন্তু তারা সবাই ব্যস্ত পরের ভিডিওটা দেখার অপেক্ষায়।

তাহলে কি প্রযুক্তি খারাপ? না, কখনওই না। ফোন খারাপ নয়। ইন্টারনেট খারাপ নয়। এগুলো অসাধারণ হাতিয়ার। কিন্তু হাতিয়ার তখনই বিপদ হয়, যখন সেটাই মালিক হয়ে যায়। তাই আমাদের ফোনকে আবার হাতিয়ার বানাতে হবে। মালিক নয়।

কিছু ছোট পরিবর্তন অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। ফোনের রঙ সাদা-কালো করে দিন। ঘুমানোর আগে ফোন দূরে রাখুন। সকালে উঠে প্রথমে স্ক্রিন নয়, সূর্যের আলো দেখুন। অপ্রয়োজনীয় ভিডিওতে “Not Interested” চাপুন। নিজের জন্য সময় বেঁধে দিন। আর সবচেয়ে জরুরি-বাস্তব জীবনে ফিরে আসুন।

বই পড়ুন। হাঁটুন। খেলুন। গান শুনুন। মায়ের সঙ্গে গল্প করুন। বাবার পাশে বসুন। বন্ধুকে ফোন করে কথা বলুন। নতুন কিছু শিখুন। চুপচাপ বসে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন। কারণ মানুষ স্ক্রল করার জন্য জন্মায়নি। মানুষ সৃষ্টি করার জন্য জন্মিয়েছে। আমরা প্রায়ই বলি, সময় নেই। কিন্তু সত্যিটা হলো, সময় নেই না-সময় চুরি হয়ে যাচ্ছে। আর সেই চুরির দরজা আমরা নিজেরাই খুলে রেখেছি।

মনে রাখবেন, আপনার মস্তিষ্ক কোনও কোম্পানির পরীক্ষাগার নয়। আপনার মনোযোগ কোনও ব্যবসায়িক পণ্য নয়। আপনার স্বপ্ন কোনও অ্যালগরিদমের কাছে হার মানার জন্য তৈরি হয়নি। এই জীবন আপনার। এই সময় আপনার। এই ভবিষ্যৎও আপনার। তাই অন্যের জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবনটা হারিয়ে ফেলবেন না।

(পূরবী প্রামাণিক)

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন