SPECIAL FEATURE
সময়ের সাথে সাথে বদলেছে সমাজ। তার সাথে বদলেছে প্রযুক্তি। তাই ভোটের সময় রাজনীতির প্রচার এখন আর শুধু মাইক, মিছিল আর দেওয়াল লিখনেই আটকে নেই, এখন তার সবচেয়ে বড় মঞ্চ স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব জুড়ে ঝকঝকে ভিডিও, আবেগঘন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, নিখুঁত এডিট, সব মিলিয়ে যেন এক রাজনৈতিক সিনেমা চলছে। কিন্তু এই “Reel”-এর বাংলা আর বাস্তবের “Real” বাংলা , দুটো কি সত্যিই একই?
রিলে সব কিছুই একটু বেশি সুন্দর। রাস্তা একটু বেশি মসৃণ, আলো একটু বেশি উজ্জ্বল, মানুষ একটু বেশি খুশি। ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল এমনভাবে সেট করা থাকে, যেন ঠিক পাশের ভাঙা নর্দমাটা ফ্রেমে না ঢুকে পড়ে। আর যদি ঢুকেই যায়, তাহলে সেটাও “ডেভেলপমেন্ট ইন প্রগ্রেস” বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। এক কথায় রিলে বাংলা সবসময় “ফিল্টার অন”, আর রিয়েলে “ফিল্টার অফ”।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতাদেরও দেখা যায় সর্বদা প্রস্তুত, পরিপাটি, ক্যামেরা-ফ্রেন্ডলি। কখনও তারা হঠাৎ চা-দোকানে ঢুকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে গল্প করছেন, কখনও বা মাঠে নেমে ফুটবল খেলছেন, সাধারণ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন, এম্বুলেন্স যাওয়ার রাস্তা করে দিচ্ছেন, আবার কখনও বৃষ্টির মধ্যে ছাতা ছাড়া হাঁটছেন। সবটাই নিখুঁত ফ্রেমে ধরা থাকে। ভিডিও আপলোড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমেন্ট বক্স ভরে ওঠে “মাটির মানুষের সঙ্গে মাটির টান” জাতীয় আবেগময় বাক্যে।
মাঠে নামলে কিন্তু অন্য গল্প শোনা যায়। যে রাস্তাটা রিলে চকচকে, সেটার পাশেই হয়তো খানাখন্দে ভরা আরেকটা গলি। যে এলাকায় আলো ঝলমলে ভিডিও শ্যুট হয়, তার একটু দূরেই হয়তো অন্ধকারে ডুবে থাকা পাড়া। সোশ্যাল মিডিয়ার “পারফেক্ট শট” আর বাস্তবের “অসম্পূর্ণ ছবি”র এই ফারাকটাই আজকের ভোট রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। রাজনীতি এখন আর শুধু বাস্তব নয়, “এডিটেড বাস্তব”।
আরও একটা বড় পরিবর্তন এসেছে ভোট প্রচারের ভাষায়। আগে যেখানে বক্তৃতা ছিল দীর্ঘ, এখন সেখানে ৩০ সেকেন্ডের “হুক”। আগে যেখানে মিছিলের ভিড় ছিল শক্তির প্রমাণ, এখন সেখানে ভাইরাল হওয়াই আসল লক্ষ্য। কে কতটা মানুষের কাছে পৌঁছল, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কে কতটা “ট্রেন্ড” করল। রাজনীতি এখন অ্যালগরিদমের খেলায় পরিণত।
তবে খেলাটা একপাক্ষিক নয়। বিরোধীরাও কম যায় না। তারা সেই রিলের “বিহাইন্ড দ্য সিন” তুলে ধরতে ব্যস্ত। কোথাও রাস্তার গর্তের ভিডিও, কোথাও বন্ধ ল্যাম্পপোস্ট, কোথাও মানুষের ক্ষোভ, সব মিলিয়ে একটা “রিয়েলিটি চেক” সিরিজও চলছে সমান্তরালে।অর্থাৎ ভোটারদের কাছে এখন দুটো চ্যানেল। একদিকে শুধুই বাংলার ‘উন্নয়ন’, অন্যদিকে শুধুই বাংলার ‘অবক্ষয়’।
সবচেয়ে মজার বিষয়, এই “রিল বনাম রিয়েল”এর খেলায় ভোটারও আর আগের মতো সরল নেই। তারা ভিডিও দেখে ঠিকই, কিন্তু অন্ধের মতো বিশ্বাস নৈব নৈব চ। শুধু আবেগে নয়, বরং ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আজকের নতুন প্রজন্ম। তারা জানে, ক্যামেরা যা দেখায়, তা সবটা সত্যি নয়। এখন এই লড়াইটা শুধু রাজনৈতিক দলের নয়। এটা “ন্যারেটিভ বনাম বাস্তব”এর লড়াই। এবার আসন্ন ভোটের ফলাফলই বলে দেবে, বাংলার মানুষ শেষ পর্যন্ত কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দিল, স্ক্রিনের গল্প, নাকি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা।


