26 C
Kolkata
Friday, March 27, 2026
spot_img

সরকারি নিয়ম কাগজে, মাটিতে অরাজকতা—বহরমপুরে চিকিৎসার রুঢ় বাস্তবতা

SPECIAL FEATURE

দেবী, বহরমপুর: ২০১২ সালে এসেছিল উমেশ শুক্লা পরিচালিত হিন্দি ছবি “ও মাই গড”। যেখানে মুখ্য চরিত্র কাঞ্জি লালজি স্বয়ং ভগবানের বিরুদ্ধে মামলা করে বলেছিলেন, তাঁর দোকান ভেঙে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ হয় ভগবান করবেন নয়ত তাঁদের “কালেকশন এজেন্ট” (অর্থাৎ, মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা যেকোনো উপাসনা স্থল)! মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুরের (Berhampore) দশাও কিছুটা তেমনই। তবে এখানে “ভগবানের” জায়গায় বসে রয়েছেন চিকিৎসকরা। আর তাঁদের “কালেজশান এজেন্ট” হিসেবে কাজ করছে, ওষুধের দোকান আর প্যাথলজি ল্যাবগুলো।

কেরল থেকে আত্মীয়ের বাড়ি মুর্শিদাবাদের লালবাগে ঘুরতে এসেছিল এক প্রবাসী বাঙালি পরিবার। তাঁদের ১০ বছরের কন্যা সন্তান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। নাগাড়ে রক্ত বমি হতে থাকে শিশুটির। লালবাগ ছোট শহর। পরিবারটির আত্মীয়রা তাঁদের বহরমপুরের একজন নামজাদা গ্যাস্ট্রো চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। যে চেম্বারে ওই ডাক্তার বসেন, তার ফোন নম্বরও দেওয়া হয়। কিন্তু ফোন করলে ওপাশ থেকে রুক্ষ ভাষায় বলা হয়, “ডাক্তারবাবুর ডেট নেই”! কবে পাওয়া যাবে? জিজ্ঞেস করলে বলা হয়, “ওরকম বলা যাবে না। এখন ওনার ডেট খালি নেই”! মুমূর্ষু মেয়েকে নিয়ে অগত্যা বহরমপুরে (Berhampore) চলে আসেন ওই দম্পতি। যদি অন্য কোনও ডাক্তারের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু অন্তত করানো যায়!

মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুর (Berhampore)। গত দুই দশকে ঐতিহাসিক এই শহরের চেহারা আমূল পাল্টেছে, তা বলাই বাহুল্য। পুরনো সিনেমাহল উঠে গিয়ে এখন তার জায়গা নিয়েছে মাল্টিপ্লেক্স! পাড়ার মুদির দোকানী এখন মাছি তাড়ান! নামজাদা প্রায় সমস্ত বড় সুপার মার্কেট এখন বহরমপুরের অলিগলিতে! শপিং মল, নামীদামী ব্র্যান্ডের জামাকাপড় থেকে ইলেকট্রনিক্স, গয়নাগাটি সবকিছুতেই বড় শহরের ছাপ। রোগ বালাইতেও পুরো মুর্শিদাবাদ জেলার ভরসা এই বহরমপুর (Berhampore)। সেই ভোরবেলা থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শহরে ভিড় করতে থাকেন রোগীরা। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন চত্বর, লালদিঘি, রানিবাগান-এর মত এলাকাগুলিতে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়েছে প্যাথ ল্যাব থেকে শুরু করে ডাক্তারদের চেম্বার! কোথাও কোথাও ভোর ৫-৬ টা থেকে রোগীর নাম লেখানর কাজ শুরু হয়।

সন্ধ্যা ৬ টা নাগাদ অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের খোঁজে বেরন ওই দম্পতি। প্রথমেই লালদিঘিতে বিভিন্ন ওষুধের দোকান, প্যাথল্যাবে খোঁজ করেন গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজিস্ট কে আছেন? লালদিঘির একটি নামজাদা ক্লিনিং তথা প্যাথল্যাবের রিসেপশনের মহিলা বলেন, “বহরমপুরে গ্যাস্ট্রোর ডাক্তার পাবেন না। এখানে ২-৩ জন ডাক্তারবাবু মাসে একবার করে এসে রোগী দেখে চলে যান।” আপনি বরং আপাতত কোনও মেডিসিনের ডাক্তারকে দেখিয়ে নিন। ওই ক্লিনিকের বাইরেই বড় বড় করে একাসধিক রোগ ও তার চিকিৎসকের নাম লেখা রয়েছে। মেয়েটির বাবা জিজ্ঞেস করেন, “আপনাদের এখানে এখন কোনও মেডিসিনের ডাক্তার থাকলে এক্ষুনি দেখাতে চাই।” রিসেপশন থেকে বলা হয়, “সরি স্যার, এখন তো সব ডাক্তার চলে গেছেন। কাল সকালের আগে কাউকে পাবেন না। আপনি রানিবাগানে চেষ্টা করতে পারেন।”

তবুও রানিবাগান না, ওই লালদিঘি অঞ্চলেই অন্য দিকটি ওষুধের দোকানে জিজ্ঞেস করতে বলা হয়, “গ্যাস্ট্রো ডাক্তার আছে, তবে উনি পরের সপ্তাহে আসবেন। এখন নাম লেখালে ৫৩ নম্বরে নাম থাকবে”। শুনে তো ওই দম্পতির চক্ষু চড়কগাছ! অগত্যা রানিবাগানের উদ্দেশ্যেই রওনা হলেন। রানিবাগানের বিখ্যাত এক দুর্গামন্দিরের গা ঘেঁষে থিক থিক করছে ওষুধের দোকান, প্যাথ ল্যাব আর ক্লিনিং, চেম্বার। একটা কিন্তু প্রায় ৩ টে ওষুধের দোকান আর ক্লিনিকে ঘুরেও লাভ হল না। পরিবারটি এতক্ষণে গ্যাস্ট্রো ডাক্তার পাওয়ার আশা ছেড়ে জেনারেল ফিজিশিয়নের খোঁজ শুরু করেছে। কিন্তু সব জায়গা থেকেই তাঁদের বলা হয়, ৭ টা বাজতে চলেছে এখন ডাক্তার নেই। বেশ কয়েকজন ওষুধের দোকানী তো এমনভাবে তাকালেন, যেন সন্ধ্যে বেলায় ডাক্তার খুঁজতে বেরিয়ে কিছু যেন অপরাধ করে ফেলেছে পরিবারটি!

অবশেষে এক সহৃদয় ওষুধ বিক্রেতা কোথাও ফোন করে নাম লিখিয়ে দিলেন মেয়েটির। হাতে একটা চিরকুট দিয়ে দুর্গা মন্দিরের পাশের গলিতে “অমুক ক্লিনিকে” গিয়ে অপেক্ষা করতে বললেন। ক্লিনিকের ভেতর হাতে গোনা ৩ টে রোগী। বাইরে থেকে একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এসে বললেন, আপনাদের জন্যই ফোন করেছিল? একটু বসুন। ডাক্তারবাবু রুগী দেখছেন। অবশেষে প্রায় ৪ ঘণ্টা গরু খোঁজার মত খুঁজে এই মুর্শিদাবাদের ঝাঁ চকচকে সদর শহর বহরমপুরে একজন জেনারেল ফিজিশিয়নের দেখা পেলেন কেরল থেকে আসা অসুস্থ একটি শিশুকন্যার পরিবার!

পরিবারটির সঙ্গে ডাক্তার খোঁজার কর্মকাণ্ডে শুরু থেকেই ছিল Aaj India-র প্রতিনিধি। স্থানীয় এক টোটোওয়ালা জানান, “সন্ধ্যেবেলায় বাইরের রোগীরা চলে যায়। তাই ক্লিনিকে পেশেন্টের সংখ্যাও কম! সবই টাকার খেলা! এখানকার ডাক্তাররা আর ভগবান নেই”! এক ওষুধের দোকানের কর্মী বলেন, “ডাক্তারবাবুরা সকালেই আসেন। সন্ধে বেলাতে তো পেশেন্ট তেমন হয় না!” লালদিঘির এক বাসিন্দা বলেন, “হাতে গোনা কয়েকজন ডাক্তার আছেন, যারা এখনও সন্ধ্যেয় ক্লিনিকে বসেন”।

প্রসঙ্গত, সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাজ্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ৮ ঘণ্টার ডিউটি বাধ্যতামূলক। সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৪ টের মধ্যে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস “নিষিদ্ধ”! তাহলে এই ডাক্তাররা কারা যারা শুধু সকালবেলাতেই বাইরে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসছেন এবং সন্ধের পর তাঁদের টিকির দেখা পাওয়া যায় না!

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “বহরমপুরে (Berhampore) চিকিৎসার নামে প্রহসন চলছে। গ্রাম থেকে আসা মানুষদের বোকা বানানোর একটা খেলা চলছে। গত কয়েকবছরেই ফুলেফেঁপে উঠেছে এই প্যাথল্যাবগুলো। অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করানো তো রয়েছেই! এমনকি কোন জায়গা থেকে টেস্ট করাতে হবে তাও বেঁধে দিচ্ছে ক্লিনিক গুলো! তার বাইরে কোথাও থেকে টেস্ট করালে তা নাকি ধার্য না!” তিনি আরও বলেন, “আরও দুঃখের বিষয় হল, ডাক্তারবাবুরা এই নোংরা খেলায় লিপ্ত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই হাসপাতালে ফাঁকি মেরে বাড়তি রোজগারের জন্য ওই সময়টা প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করছেন!”

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন