SPECIAL FEATURE
স্নেহা পাল, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে ফের জোরালো হয়েছে দলবদলের (Party Change) রাজনীতি। চাকরি বদলের মতোই ঘন ঘন পরিবর্তন হচ্ছে নেতাদের মতাদর্শ। লাল থেকে সবুজ বা সবুজ থেকে কমলা, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের ঘন ঘন ‘রঙ পরিবর্তন’ শুধু রাজনৈতিক সমীকরণই বদলাচ্ছে না, বরং গণতন্ত্রে আস্থা, আদর্শিক অবস্থান এবং ভোটারদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
দলবদলের সাম্প্রতিক চিত্র
রাজ্যে নিবার্চনের আবহে গত কয়েক মাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখ দল পরিবর্তন (Party Change) করেছেন। সিপিআই(এম)-এর প্রাক্তন যুব নেতা প্রতীকুর রহমান তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এর আগে বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা তৃণমূলে যোগ দেন। প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাসও বিজেপি ছেড়ে ফের তৃণমূল শিবিরে ফিরে আসেন।
পশ্চিমবঙ্গে দলবদল (Party Change) নতুন নয়, তবে এর তীব্রতা বেড়েছে গত এক দশকে। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধী দল থেকে শাসক দলে যোগ দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপির উত্থান এই প্রবণতাকে আরও জোরদার করে। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে একাধিক নেতা প্রায়ই যাতায়াত করতে থাকেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ব্যাপক হারে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগদানের ঘটনা ঘটে। তবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আবার অনেকেই পুরনো দলে ফিরে যান। এই “ঘর ছেড়ে যাওয়া, ঘরে ফেরা” রাজনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন কী বলছে ?
ভারতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে ‘অ্যান্টি-ডিফেকশন আইন’ (সংবিধানের দশম তফসিল) অনুযায়ী, কোনও সাংসদ বা বিধায়ক দলত্যাগ করলে বা দলের নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনের পরে কোনও দলে যোগ দিলে তাঁরাও অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন। তবে সাধারণ কর্মী বা নেতা যাঁরা নির্বাচিত প্রতিনিধি নন, তাঁদের ক্ষেত্রে এমন কোনও আইনি বাধা নেই। ফলে তাঁরা সহজেই দল পরিবর্তন করতে পারেন, যা বাস্তবে দলবদলের প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কেন বাড়ছে দলবদল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক নেতাই মনে করেন, যে দলে থাকার ফলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে, সেই দিকেই ঝোঁকা প্রয়োজন। ফলে দলবদল অনেক ক্ষেত্রে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠছে। সমাজবিদদের মতে, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং ভোক্তাবাদী সংস্কৃতির প্রভাব রাজনীতিতেও পড়েছে। ব্যক্তিগত লাভ, প্রভাব এবং অবস্থান এখন অনেক সময় মতাদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি ক্রমশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বৃহৎ সংখ্যক মানুষের কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য আর কেবল কোনও দলের মতাদর্শের উপর নির্ভর করে না। বরং নির্দিষ্ট নেতা বা ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সমর্থনই অনেক ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই গত এক থেকে দেড় দশকে রাজ্যে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। মুসলিম ভোটের পাশাপাশি মতুয়া, রাজবংশী, আদিবাসীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ভিত্তিক ভোটব্যাঙ্ক এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে রাজনীতির চরিত্রও বদলেছে। দলীয় মতাদর্শের চেয়ে সম্প্রদায়ভিত্তিক সমীকরণ এবং নেতৃত্বকেন্দ্রিক সমর্থন এখন অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে।
ভোটারদের উপর প্রভাব
দলবদলের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোটারদের উপর। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা যাঁকে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থী হিসেবে ভোট দেন, তিনি পরবর্তীতে দল পরিবর্তন করলে ভোটারদের সঙ্গে প্রতিনিধির সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়া দলের উপর আস্থা রেখে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী করেন মানুষ। এরপর সেই দলকে যখন প্রার্থী ত্যাগ করে অন্য বিরোধী দলে চলে যান তখন তা মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার শামিল। এর ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর আস্থা কমে যায় এবং ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে অন্য দিকও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভোটাররা দল নয়, ব্যক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে কোনও জনপ্রিয় নেতা দল পরিবর্তন করলেও তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থন অটুট থাকে।
গণতন্ত্রের উপর প্রভাব
ঘন ঘন দলবদল রাজনৈতিক দলগুলির ভিত দুর্বল করে দিতে পারে। এতে দলের সংগঠন, আদর্শ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে এটি গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং আদর্শ যদি দ্রুত বদলে যায়, তাহলে ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দলবদলের প্রবণতা ততই স্পষ্ট হচ্ছে। এটি একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে। ভোটাররা এই পরিবর্তনকে কীভাবে গ্রহণ করেন, তা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলেই প্রতিফলিত হবে।


