Aaj India Desk, কলকাতা: দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং পাস বিক্রিকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের (Indranil Sen) বাড়িতে ইডির (ED) তল্লাশির পর নতুন করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে দাবি, ‘মাস আর্ট’-এর উদ্যোগে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের নিয়ে কলকাতার বাছাই করা পুজোমণ্ডপ ঘোরানোর যে ব্যবস্থা করা হত, সেই সফরের সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনের বাড়ির নীচে থাকা ‘মায়া আর্ট গ্যালারি’র কোনও যোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ, পুজো দেখানোর জন্য পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া বাসগুলির এক পর্যায়ে মায়া আর্ট গ্যালারিতে যাওয়া হত। সেখানে বাংলার হস্তশিল্প, শাড়ি, পেন্টিং-সহ বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা ছিল বলে অভিযোগ। পর্যটকদের সেইসব সামগ্রী কেনার জন্য উৎসাহিত করা হত এবং কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক ভাবে বেশি রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এখন ইডির তদন্তে মূল প্রশ্ন—পর্যটকদের ওই গ্যালারিতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল? সেখানে বিক্রি হওয়া সামগ্রীর টাকা কার কাছে যেত? পণ্যগুলি কারা সরবরাহ করতেন? আর ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে মায়া আর্ট গ্যালারির কোনও আর্থিক লেনদেন ছিল কি না?
এই যোগসূত্র প্রমাণিত হলে তদন্তের পরিধি শুধু পুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রি বা অর্থ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তখন খতিয়ে দেখা হতে পারে, একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৈরি হওয়া পর্যটক প্রবাহকে কোনও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।
কারণ, massArt নিজেদের কলকাতাভিত্তিক একটি non-profit art platform হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছে। নেদারল্যান্ডস সরকারের একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ওয়েবসাইটেও massArt-কে non-profit platform হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের কাজের মধ্যে contemporary art, public art, architecture এবং cultural exchange-এর মতো বিষয় রয়েছে। তাই একটি non-profit সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সঙ্গে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কোনও আর্থিক যোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই মামলায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সচিবালয়ের এক Officer on Special Duty বা OSD-র ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই আধিকারিকের সঙ্গে এই ব্যবস্থার যোগ ছিল। তিনি কোনও প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন কি না, কিংবা কোনও আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না—এসবই এখন তদন্তের বিষয়। তবে এই অভিযোগগুলির কোনওটাই এখনও প্রমাণিত নয়। ইডিও এখনও এ বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
গোটা বিতর্কের সূত্রপাত দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ থেকে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো UNESCO-র Intangible Cultural Heritage-এর স্বীকৃতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সামনে পুজোকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। এরপরের বছর থেকেই massArt বিশেষ দুর্গাপুজো প্রিভিউয়ের আয়োজন শুরু করে।
জুন মাসে কলকাতা পুলিশের কাছে জমা পড়া একটি অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেন, তাঁর স্ত্রী এবং massArt-এর কয়েকজন পদাধিকারীর নাম ছিল বলে The Indian Express জানিয়েছে। অভিযোগের মধ্যে ছিল UNESCO-র সঙ্গে সম্পর্কের দাবি এবং দুর্গাপুজোর প্রিভিউ পাস ঘিরে অর্থ সংগ্রহের বিষয়।
তবে UNESCO-কে ঘিরে বিষয়টি নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ২০২৫ সালের massArt-এর একটি প্রিভিউ অনুষ্ঠানে UNESCO-র South Asia Regional Office-এর Director Tim Curtis উপস্থিত ছিলেন বলে সমসাময়িক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাই UNESCO-র নাম ব্যবহার, কোনও আনুষ্ঠানিক পার্টনারশিপ এবং UNESCO-র কোনও প্রতিনিধির অনুষ্ঠানে উপস্থিতি—এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখা যায় না। তদন্তে আসল বিষয় হবে, ঠিক কী দাবি করা হয়েছিল এবং তার পিছনে কী ধরনের অনুমোদন ছিল।
ইডি সূত্র উদ্ধৃত করে The Indian Express জানিয়েছে, প্রিভিউ শো ঘিরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই টাকার কোনও অংশ ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরানো হয়েছিল কি না, কোথা থেকে টাকা এসেছিল, কোথায় জমা পড়েছিল এবং কারা এর সুবিধা পেয়েছিলেন—এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে ৫০-৬০ কোটি টাকার অঙ্কটি এখনও তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে উঠে আসা অভিযোগ, প্রমাণিত আর্থিক তছরুপের অঙ্ক নয়।
মঙ্গলবার সকাল থেকে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালায় ইডি। ইন্দ্রনীল সেনের কলকাতার বাড়ি ছাড়াও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য সম্পত্তি এবং এক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ীর ঠিকানাতেও তল্লাশি হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইডি সূত্রের দাবি, তদন্তের অংশ হিসেবে ইন্দ্রনীলকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইন্দ্রনীল সেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই মুহূর্তে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল টাকার গতিপথ। প্রিভিউ বা পাস বিক্রি থেকে কত টাকা এসেছিল, সেই টাকা কোথায় গিয়েছিল, কীভাবে খরচ হয়েছিল এবং কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান আর্থিক সুবিধা পেয়েছিল কি না—এসবের উত্তরই খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
আর সেই কারণেই মায়া আর্ট গ্যালারির প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুজো দেখানোর জন্য আনা পর্যটকদের বাস যদি সত্যিই নিয়মিত ভাবে ওই গ্যালারিতে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কেন তাঁদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হত এবং সেই কেনাকাটা থেকে কারা আর্থিক ভাবে লাভবান হতেন—এখন তদন্তে সেই প্রশ্নগুলির উত্তরই খোঁজা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গোটা বিষয়টিই এখনও তদন্তাধীন। অভিযোগগুলির কোনওটিই আদালতে প্রমাণিত হয়নি।


