Aaj India Desk, নয়াদিল্লি: ভয়াবহ হড়পা বানে কার্যত বিপর্যস্ত নেপাল (Nepal Flash Flood)। হিমালয় থেকে নেমে আসা প্রবল জলের স্রোতে দেশের একাধিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়েছে জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো। নেপাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এই বানের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নেপালের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বাণিজ্যেও।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভারতে বিদ্যুৎ পাঠানোর পরিমাণ প্রায় অর্ধেক করে দিয়েছে নেপাল। সাধারণ সময়ে নেপাল থেকে ভারত প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট (MW)বিদ্যুৎ পেয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিমাণ কমে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
গত ২৬ অগস্ট হড়পা বান আছড়ে পড়ার সময়ও সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ভারত নেপাল থেকে প্রায় ৯৬৩.৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছিল। কিন্তু বানের জলে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ দুটোই ধাক্কা খেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার দেবীঘাট (Debighat) জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই প্রকল্প থেকেই সরাসরি ভারতে বিদ্যুৎ পাঠানো হত। পাশাপাশি চিলিমে ও ত্রিশূলী প্রকল্পেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রফতানিও আপাতত সমস্যার মুখে পড়েছে।
বানের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত বড় প্রকল্পগুলির তালিকায় রয়েছে ২১৬ মেগাওয়াটের আপার ত্রিশূলী-১, ১১১ মেগাওয়াটের রসৌয়াগড়ী, ১২০ মেগাওয়াটের রসৌয়া ভোটেকোশি এবং ৭৮ মেগাওয়াটের সাঞ্জেন খোলা। এছাড়াও ২২ মেগাওয়াটের চিলিমে, ২০ মেগাওয়াটের লাইদাং খোলা, ৬.৪২ মেগাওয়াটের আপার মাইলুং-এ এবং ৫ মেগাওয়াটের মাইলুং খোলা প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
নুওয়াকোট জেলাতেও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে মোট ১২৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার চারটি চালু প্রকল্প এবং আরও ৫২.৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি নির্মীয়মাণ প্রকল্প জলের প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
ভারত ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ লেনদেন মূলত মরশুমের উপর নির্ভরশীল। বর্ষাকালে নেপালের পাহাড়ি নদীগুলিতে জলের পরিমাণ বেড়ে গেলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ে। তখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারতকে বিক্রি করে নেপাল। আবার শীতকালে নদীতে জলের পরিমাণ কমে গেলে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায় এবং তখন ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়। কিন্তু, এবারের হড়পা বানে বর্ষার সময়ই একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই স্বাভাবিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বড় ধাক্কা খেয়েছে। এর ফলে ভারত ও নেপাল—দুই দেশেরই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, নেপালের বন্যা পরিস্থিতিতে মৃতের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৭৫০-রও বেশি মানুষ। যদিও কিছু বেসরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১,৫০০ বলে দাবি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে ১,৪০০-র বেশি মানুষের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯০ জন ভারতীয়র সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নেপালে আটকে রয়েছেন বহু ভারতীয় পর্যটক, কর্মী এবং কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রীরাও।
নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধানে কাঠমান্ডুতে থাকা ভারতীয় দূতাবাস নেপাল সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং পর্যটন সংস্থাগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। একইসঙ্গে তিব্বতে আটকে থাকা প্রায় ২০০ জন ভারতীয় কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রীকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও চিনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে ভারত।
সব মিলিয়ে, ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানের জেরে নেপালে প্রাণহানির পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যেও বড়সড় প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলি দ্রুত মেরামত করা এখন নেপালের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।


