নদিয়া: বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরত্ব। আর সেই পথেই যেন ওত পেতে ছিল আততায়ী! নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান (Anisur Rahman) এবং তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ানের জোড়া খুন ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে রেলগেটের কাছে তাঁদের গাড়ি আটকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থলেই বাবা ও ছেলের মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা। কে বা কারা এই হামলা চালাল? কেনই বা একই সঙ্গে নিশানা করা হল বাবা ও ছেলেকে? রাজনৈতিক শত্রুতা, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও কারণ? একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
বাড়ির এত কাছে, তবু রক্ষা হল না!
স্থানীয় সূত্রে খবর, আনিসুর রহমান (Anisur Rahman) ও তাঁর ছেলে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। রেলগেটের কাছে আচমকাই তাঁদের গাড়ি আটকে দেয় দুষ্কৃতীরা। অভিযোগ, এরপরই গুলি চালানো হয়। শুধু গুলিই নয়, ধারালো অস্ত্র দিয়েও হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়, ঘটনাস্থল তাঁদের বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে বলে জানা গিয়েছে।
হামলার পর এলাকায় হইচই পড়ে যায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় নাকাশিপাড়া থানার পুলিশ। উদ্ধার করা হয় দু’জনের দেহ। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই ঘটনাস্থলে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ।
কে ছিলেন আনিসুর রহমান?
নিহত আনিসুর রহমান (Anisur Rahman) ছিলেন দীর্ঘদিনের সক্রিয় কংগ্রেস নেতা। প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি নদিয়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং নাকাশিপাড়া ব্লক কংগ্রেস (Congress) কমিটির প্রাক্তন সভাপতি ছিলেন। এলাকায় কংগ্রেসের সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরিবারের দাবি, সাধারণ মানুষের পাশে থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাবেও সক্রিয় ছিলেন আনিসুর।
তাহলে কি সেই রাজনৈতিক সক্রিয়তাই তাঁর ‘শত্রু’ তৈরি করেছিল?
পরিবারের তরফে এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। নিহত নেতার শ্যালিকার দাবি, রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও সক্রিয়তার কারণেই তাঁকে নিশানা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে একই হামলায় তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান (Abu Sufiyan) কেন খুন হলেন, সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবারের মধ্যে।
তদন্তে ‘জেলবন্দি’ নেতার নাম!
ঘটনার তদন্তে নেমে রবিবার সকালে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে জুব্বার শেখের নাম উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তিনি ফতেমা বিবির স্বামী এবং এলাকার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি। চাঞ্চল্যের আরও বড় কারণ, জুব্বার শেখ বর্তমানে জেলবন্দি।
পরিবারের অভিযোগ, জেল থেকেই এই জোড়া খুনের পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। জুব্বার শেখের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
‘রাজনৈতিক শত্রুতা’, নাকি আরও বড় কোনও রহস্য?
এই মুহূর্তে পুলিশের সামনে একাধিক প্রশ্ন,
- কেন আনিসুর রহমান (Anisur Rahman) ও তাঁর ছেলেকে নিশানা করা হল?
- কারা হামলার পিছনে?
- জেলবন্দি জুব্বার শেখের সঙ্গে কি সত্যিই কোনও যোগ রয়েছে?
- রাজনৈতিক শত্রুতাই কি খুনের কারণ?
- নাকি নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও বিরোধ?
পুলিশ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। হামলায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কংগ্রেসের ‘কালা দিবস’, তীব্র আক্রমণ বিরোধীদের
জোড়া খুনের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস (Congress) সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। তাঁর অভিযোগ, আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার রাজ্যজুড়ে ‘কালা দিবস’ পালনের ডাক দিয়েছেন তিনি। প্রাক্তন সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরীও ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নদিয়ার এই জোড়া খুন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ফের বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তবে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রেলগেটের সেই রাতের হামলার আসল মাস্টারমাইন্ড কে? তদন্ত যত এগোবে, হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তরও মিলবে।


