OPINION PIECE
যদি আজ কেউ ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের দেশপ্রেম বা অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে মহারাষ্ট্রজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠবে। কিন্তু যখন বারবার সেই প্রশ্নের নিশানায় উঠে আসেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, যাঁর “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” আহ্বান আজও কোটি ভারতীয়র হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন জ্বালায়, তখনও আশ্চর্যজনকভাবে ভীত, নীরব আমাদের এই বাঙালি জাতি। (Netaji Subhas Chandra Bose)
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত কয়েক মাসে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মুখ নেতাজিকে ঘিরে একের পর এক উঠে এসেছে কদর্য মন্তব্য। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের গোড়ায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খোদ বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসু এবং ফরওয়ার্ড ব্লক সম্পর্কে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীদের স্রেফ ‘গুণ্ডা’ বলে আখ্যা দেন তিনি। (Netaji Subhas Chandra Bose)
বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজও দাবি করেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন ও পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা ছিল না। তাঁর বক্তব্য ছিল, আজাদ হিন্দ ফৌজ আসলে নেতাজির তৈরি বাহিনী নয়, বরং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এমন একটি অংশ, যাদের জার্মানরা বন্দি করেছিল এবং পরে সেই বাহিনী নেতাজির হাতে তুলে দেওয়া হয়। এমনকি তিনি অভিযোগ করেন, নেতাজি সেই বাহিনীর “অপব্যবহার” করেছিলেন। এখানেই থেমে থাকেননি অনন্ত মহারাজ। তিনি কোচবিহারের মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের ভূয়সী প্রশংসা করে দাবি করেন, তিনিই নাকি হিটলার এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে (INA) পরাজিত করেছিলেন। (Netaji Subhas Chandra Bose)
শুধু মন্তব্য নয়, নির্বাচনের আগে মালদহের মানিকচকে নেতাজির মূর্তিতে জুতো পরে ওঠা, গেরুয়া পতাকা জড়ানো, নির্বাচনে জেতার পর থেকে বিজেপি কর্মী সমর্থকদের একাংশের সমাজ মাধ্যমে ক্রমাগত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে নিম্মরুচির কুৎসাপূর্ন পোস্ট, সম্পাদিত ছবির বার বাড়ন্ত দেখে প্রশ্ন জাগে, রাজনৈতিক মতবিরোধের যুদ্ধে কেনো ইতিহাসের অন্যতম সাহসী নেতার প্রতি উজার করে প্রকাশ করা হচ্ছে এমন নগ্ন সহিংসতা?
অবশ্যই, ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। নেতাজি, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গান্ধীজি, নেহরু, প্রত্যেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলবে, নতুন তথ্য সামনে আসবে, মতবিরোধও থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন আর রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতীয় বীরের অবদানকে খাটো করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের শক্তি, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত থাকে তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতাও।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এতগুলি বিতর্কের পরেও জাতীয় স্তরে তেমন কোনও বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক আলোড়ন দেখা যায়নি। যে নেতাজির নামে প্রতি বছর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং দেশপ্রেমের ভাষণ হয়, তাঁর অবদান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পরেও কার্যত চুপ বাঙালি সমাজ।
রাজনীতি ক্ষমতার লড়াই। মতাদর্শের সংঘর্ষ গণতন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কদের বারবার রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রে দাঁড় করানো এক বিপজ্জনক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কোনও দলের সম্পত্তি নন, তিনি ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তথ্যবিহীন বা বিতর্কিত মন্তব্যকে যদি বারবার স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়, তবে শুধু একজন নেতার স্মৃতি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা বাঙালি জাতির সম্মান। আজ প্রশ্ন একটাই, নেতাজির উত্তরাধিকার রক্ষার দায় কি শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার্ঘ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠলে সব রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তারও প্রতিবাদ হবে?


