Aaj India Desk, কলকাতা: ছয় বছর আগে সুপার সাইক্লোন আমফানের (Amphan Cyclone) ধাক্কায় সুন্দরবন-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের ক্ষত আজও অনেক জায়গায় রয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে আমফানের ত্রাণ ও নদী বাঁধ পুনর্গঠন নিয়ে সামনে এসেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)-এর একটি রিপোর্ট, যা ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।
গত ২৫ জুলাই প্রকাশিত CAG-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমফানের পর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ত্রাণ ও নদী বাঁধ পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থ চাওয়ার সময় তৎকালীন রাজ্য সরকার প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অতিরিক্ত দেখিয়েছিল।
CAG রিপোর্টে কী কী অভিযোগ রয়েছে?
৩২,০০০ কোটির অতিরিক্ত দাবি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের নদী বাঁধ, পরিকাঠামো এবং ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কেন্দ্রের কাছে প্রকৃতের তুলনায় অনেক বেশি দেখানো হয়েছিল।
১২৫.০৭ কোটি টাকার লেনদেনে গরমিল: রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ১৭৫টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মোট ১২৫.০৭ কোটি টাকার লেনদেনে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবর্তে এই টাকার একটি অংশ প্রভাবশালী ব্যক্তি, তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়।
ডুপ্লিকেট উপভোক্তার নামে ১৮.০৭ কোটি: ঘর নির্মাণ ও বাঁধ স্থানান্তরের অনুদান ৯,২২৬ জন ভুয়ো বা একই ব্যক্তির একাধিক নামে থাকা অ্যাকাউন্টে বারবার পাঠানো হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মোট ১৮.০৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
পুরনো তালিকা ব্যবহার করে ২.৮২ কোটি বণ্টন: ২০২০ সালের আমফান ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ অর্থ বিতরণে ২০১৯ সালের বুলবুল ঘূর্ণিঝড়ের উপভোক্তাদের তালিকা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে CAG জানিয়েছে। সেই তালিকার ৫,৬২৭ জনের মধ্যে মোট ২.৮২ কোটি টাকা দেওয়া হয়।
নদী বাঁধ নির্মাণে একাধিক ত্রুটি: রিপোর্টে বলা হয়েছে, বহু জায়গায় কংক্রিট ও মাটির বাঁধ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তৈরি হয়নি। কোথাও ঢাল কম, কোথাও উচ্চতা নির্ধারিত মানের নিচে ছিল।
ত্রুটিপূর্ণ বোল্ডার পিচিং: নদীর পাড় রক্ষায় প্রয়োজনের তুলনায় পাতলা পাথরের স্তর ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এতে জোয়ারের সময় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
অসম্পূর্ণ কাজ: গোসাবা, সাগর, বাসন্তী, কুলতলি ও ক্যানিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাঁধ মেরামতের বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বরাদ্দ অর্থ খরচ হওয়ার পরও শেষ হয়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
নজরদারির অভাব: CAG-এর দাবি, উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো হলেও সেই প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ক্ষতি: প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাড়াহুড়ো করে রাস্তা ও বাঁধ তৈরির সময় বহু জায়গায় অনুমতি ছাড়াই ম্যানগ্রোভ অরণ্য কেটে ফেলা হয়েছে, যা উপকূলের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সুরক্ষাকে আরও দুর্বল করেছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিক্রিয়া
রিপোর্ট প্রকাশের পর সুন্দরবনের বহু বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা বলেন, “আমাদের বাড়ির দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল। একটা ত্রিপলও পাইনি। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে দিন কাটিয়েছি, সেটা শুধু আমরাই জানি।” তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
CAG রিপোর্ট নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “এই বিষয়ে ববি, অরূপ বিশ্বাস বা জাভেদ খান ভালো বলতে পারবেন। তখন ওরাই সংশ্লিষ্ট দফতরের দায়িত্বে ছিলেন।”অন্যদিকে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, “CAG বেছে বেছে তথ্য দিয়েছে কি না, তা আগে খতিয়ে দেখা দরকার। যাঁরা দল ছেড়েছেন, তাঁরা যে দফতরের দায়িত্বে ছিলেন, সেই হিসাব রিপোর্টে বাদ পড়েছে কি না, সেটাও দেখতে হবে।”
বিজেপির প্রতিক্রিয়া
রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার অভিযোগ করেন, “কেন্দ্র থেকে আসা ত্রাণের টাকা লুট হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের উচিত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।”


