32 C
Kolkata
Friday, September 4, 2026
spot_img

নেপালের বন্যায় ১২টি স্কুল নিশ্চিহ্ন, ৬০০ শিশু নিখোঁজ! সন্তানদের অপেক্ষায় শত শত পরিবার

Aaj India Desk, নয়াদিল্লি: নেপালের ভয়াবহ বন্যার (Nepal Flash Flood) এক সপ্তাহেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। জল নেমেছে, উদ্ধারকাজ (Rescue Operation) চলছে, কিন্তু বহু পরিবারের কাছে বিপর্যয় এখনও শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে তাঁদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সন্তান কোথায়? সে কি বেঁচে আছে?‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রসুয়া (Rasuwa) ও নুয়াকোট (Nuwakot) জেলায় অন্তত ৬০০ শিশুর কোনও সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে শুধু নুয়াকোটেই প্রায় ৩০০ পড়ুয়ার নিখোঁজ থাকার প্রাথমিক অনুমান করা হয়েছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

বন্যার জলের সঙ্গে ভেসে গিয়েছে বহু রাস্তা, সেতু এবং পাহাড়ি পথ। অচল হয়ে পড়েছে মোবাইল ও টেলিকম পরিষেবার বড় অংশ। ফলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা তো দূরের কথা, কোন শিশু কোথায় রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তালিকাও তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই সংকট আরও ভয়াবহ হয়েছে স্কুলগুলির ধ্বংসের কারণে। যে স্কুলগুলি সাধারণত পড়ুয়াদের উপস্থিতি ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, সেগুলির অনেকগুলিই আর নেই। রসুয়ায় ৪টি এবং নুয়াকোটে ৮টি—মোট ১২টি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

নুয়াকোট শিক্ষা উন্নয়ন ও সমন্বয় ইউনিটের প্রধান সূর্য বাহাদুর খতরি জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিখোঁজ পড়ুয়াদের তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। তাঁর কথায়, “যদিও খুব সামান্য কিছু নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে শেষমেশ খুঁজে পাওয়া গেছে, কিন্তু প্রতিদিন বিভিন্ন স্কুল থেকে আরও নতুন নতুন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর আসছে। আমাদের প্রাথমিক অনুমান, শুধু নুয়াকোট জেলাতেই অন্তত ৩০০ জন শিক্ষার্থী নিখোঁজ রয়েছে।”

নুয়াকোটের স্কুল পরিদর্শক নবরাজ সপকোটার কথায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, “এমনও দেখা যাচ্ছে যে বেঁচে থাকা বাবা-মা তাঁদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে খুঁজে পাচ্ছেন না, আবার অন্যদিকে কোনও কোনও পরিবারে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীরা খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের নিখোঁজ বাবা-মাকে।”

একটি ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, বন্যার পরে তাঁদের পুরো স্কুল চত্বরটাই যেন নদীর চরে পরিণত হয়েছে। চারপাশের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে, সভ্যতার সব চিহ্ন এক ঝটকায় মুছে গিয়েছে।

শুধু শিশু নয়, গোটা নেপালেই নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে চলছে হাহাকার। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের দেওয়ালে তৈরি হয়েছে ‘ওয়াল অব দ্য মিসিং’। সেখানে নিখোঁজদের ছবি ও পরিচয় জমা দিচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। মর্গে থাকা পরিচয়হীন দেহের সঙ্গে সেই ছবিগুলি মিলিয়ে স্বজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধসে যাওয়া রাস্তা, ভেঙে পড়া সেতু এবং অচল নেটওয়ার্কের কারণে উদ্ধারকারীদের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৬ অগস্ট হিমবাহ ধসের পর বন্যা ও ধসে নেপালজুড়ে ৪,২০০-র বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ এবং ১,২০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যেই কিছুটা আশার খবরও এসেছে। ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে টানা ন’দিন আটকে থাকার পর দু’জন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী শুক্রবার সকালে মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ এবং মেকানিক্যাল সুপারভাইজর কবীর মহারাজনকে উদ্ধার করে। তাঁদের জরুরি অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছে। নেপালের ছ’টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ৯০০-র বেশি শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। শুধু ত্রিশূলী প্রকল্পেই নিখোঁজ ছিলেন ৪০ জন।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় অন্তত ১৭,০০০ শিশু এই দুর্যোগে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জন্য দ্রুত ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। তবে ৬০০ শিশুর নিখোঁজ থাকার খবরই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এই সংখ্যার মধ্যে কতজন সত্যিই নিখোঁজ, কতজন নিরাপদ জায়গায় রয়েছে বা কতজনকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখনও সম্ভব হয়নি—তা স্পষ্ট নয়। তাই এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হল যোগাযোগ ব্যবস্থা ফেরানো, বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলিকে যুক্ত করা এবং প্রতিটি শিশুর অবস্থান নিশ্চিত করা। আর যতক্ষণ সেই কাজ শেষ না হচ্ছে, ততক্ষণ শত শত পরিবার শুধু একটাই আশায় দিন গুনবে—হয়তো একদিন ফোনটা বাজবে, ওপার থেকে ভেসে আসবে সন্তানের কণ্ঠ।

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

আরও পড়ুন