Aaj lndia Desk,কাঠমান্ডু: ভয়াবহ হড়পা বানের ধাক্কা সামলে এখনও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি নেপাল ও তিব্বত। ঘটনার দ্বিতীয় সপ্তাহেও বহু এলাকায় শুধুই ধ্বংসের ছবি। পাহাড়ি পথে কাদা-পাথরের স্তূপ, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে উদ্ধারকাজও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত কঠিন। ইতিমধ্যেই মৃতের সংখ্যা ৯৫০ ছাড়িয়েছে। এখনও ৪৪০০-র বেশি মানুষের কোনও খোঁজ নেই। ভারতের নিম্নপ্রবাহের নদীগুলি থেকেও অন্তত ১৭টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
হিমবাহ ধস থেকেই বিপর্যয়ের শুরু
গত বুধবার চিন-নেপাল সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসের পর আচমকাই বিপুল জলরাশি নেমে আসে। জলের সঙ্গে ভেসে আসে বড় বড় পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। প্রবল স্রোতে নেপাল এবং তিব্বতের একাধিক গ্রাম ও শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেঙে পড়ে বহু রাস্তা ও সেতু। ক্ষতির মুখে পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রও। একাধিক এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেখানে পৌঁছনোটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সুড়ঙ্গে আটকে প্রায় ১০০ কর্মী?
নেপালের রাসুয়া জেলাকে ঘিরে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একাধিক সুড়ঙ্গে প্রায় ১০০ জন কর্মী আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দু’টি সুড়ঙ্গ থেকে ইতিমধ্যেই তিনটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। কাদা ও ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভিতরে ঢোকা কঠিন। এক ভারতীয় সেনা আধিকারিক জানিয়েছেন, ঘন কাদার স্তর সরিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। এখনও আটকে থাকা কর্মীদের জীবিত উদ্ধারের আশা ছাড়েননি তাঁরা।
২০ হাজারের বেশি কর্মী উদ্ধারকাজে
বিপর্যয় মোকাবিলায় নেপাল প্রায় ২০,৬০০ জনকে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজে মোতায়েন করেছে। দুর্গত এলাকা থেকে এখনও পর্যন্ত ৩১০০-র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই বিপর্যয়কে ‘অকল্পনীয় এবং হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
মর্গে জায়গা নেই, DNA নমুনা সংগ্রহ
মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নেপালের মর্গগুলিতে জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে অশনাক্ত দেহগুলির DNA নমুনা সংগ্রহ করে শেষকৃত্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। পরে DNA পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারগুলির কাছে দেহ শনাক্ত করার সুযোগ রাখা হবে।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। উদ্ধার হওয়া দেহের ছবি দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। দেহ সংরক্ষণের জন্য নেপালের প্রয়োজন ১০০০-র বেশি ফ্রিজার ইউনিট। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ৫৯২ জন বিদেশিও। তাঁদের মধ্যে কৈলাস পর্বতগামী ট্রেকার এবং হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
তিব্বতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
চিনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, তিব্বতে এখনও পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ৫৪৬ জন। বিপর্যয় মোকাবিলায় ২০০০-র বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। তবে দুর্যোগের মূল কেন্দ্রের কাছে পৌঁছনো এখনও কঠিন।
তিব্বতি অধিকারকর্মীদের কয়েকটি সংগঠন চিনের প্রকাশিত মৃত ও নিখোঁজের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। যদিও বেজিং সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চিনের দাবি, হতাহতের বিষয়ে তথ্য প্রকাশে তারা ‘খোলামেলা, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী’ ভূমিকা নিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাড়ছে চিন্তা
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের পরই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের হিমবাহ-নির্ভর বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানালও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিবর্তিত জলবায়ুর অন্যতম বড় শিকার নেপালের মানুষ। রাষ্ট্রপুঞ্জের শিশু বিষয়ক সংস্থাও পরিস্থিতিকে ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে ওঠা বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থার মতে, কয়েক হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাঁদের জন্য বড় মাত্রায় মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।


